চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশে অন্তত ২২৪ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। তাদের মধ্যে ১২৭ জন স্কুল ও সমমানের শিক্ষার্থী, ৪৭ জন কলেজ ও সমপর্যায়ের এবং ৫০ জন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। নিহতদের মধ্যে নারী শিক্ষার্থী ১৩২ জন এবং পুরুষ ৯২ জন। অর্থাৎ, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২৮ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।
সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় এ তথ্য উঠে এসেছে। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে তথ্যগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির সভাপতি তানসেন রোজ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৭১৪। ওই বছর দেশে আত্মহত্যার অপরিশোধিত মৃত্যুহার ছিল প্রতি লাখে ২ দশমিক ৮ জন। তবে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে এ হার ছিল তুলনামূলক বেশি—প্রতি লাখে ৪ দশমিক ৭ জন।
জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্যেও দেশে আত্মহত্যার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া যায়। ২০১৭ সালে আত্মহত্যার মৃত্যুহার প্রতি লাখে ৪ জন থাকলেও ২০২২ সালে তা বেড়ে ৮ দশমিক ৯৯ জনে পৌঁছায়। অথচ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অনুযায়ী ২০২৫ সালের মধ্যে এ হার ৩ দশমিক ৫-এ নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারিত ছিল।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরের তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা ও প্রচেষ্টার প্রবণতা বেশি। শহরের ৮ দশমিক ২ শতাংশ তরুণ আত্মহত্যার চিন্তার কথা জানিয়েছেন। গ্রামাঞ্চলে এ হার ৩ দশমিক ৭ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যার পেছনে কোনো একটি কারণকে দায়ী করা যায় না। পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন, দাম্পত্য কলহ, পড়াশোনায় ব্যর্থতা, পরীক্ষার চাপ, বেকারত্ব, বিষণ্নতা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, মাদকাসক্তি ও আকস্মিক রাগসহ নানা বিষয় একজন মানুষকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
এ ছাড়া অল্প বয়সে বিয়ে, পারিবারিক সহিংসতা এবং প্রতিকূল সামাজিক পরিবেশও ঝুঁকি বাড়াতে পারে। গবেষণায় উঠে এসেছে, অনেক আত্মহত্যার চেষ্টা দীর্ঘ পরিকল্পনার ফল নয়; বরং তীব্র মানসিক চাপ বা আবেগের মুহূর্তে তাৎক্ষণিকভাবেও এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
আত্মহত্যার প্রচেষ্টায় শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে ফেলা, ফাঁস ও বিষপানের মতো পদ্ধতির উল্লেখ পাওয়া গেছে। অতীতে বাংলাদেশে কীটনাশক পানও আত্মহত্যার অন্যতম প্রচলিত পদ্ধতি ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মহত্যা প্রতিরোধে ঝুঁকিপূর্ণ উপকরণের সহজলভ্যতা কমানো, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং পরিবার ও সমাজের সহায়তা জোরদার করা জরুরি।
আঁচল ফাউন্ডেশনের লিড সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. সায়েদুল ইসলাম সাইদ বলেন, আত্মহত্যার পেছনে সাধারণত একাধিক সমস্যা একসঙ্গে কাজ করে। কেউ আত্মহত্যার কথা বললে সেটিকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। বরং দ্রুত তার কথা শুনে প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে।
তিনি জানান, ২০২৪ সালে প্রতি এক লাখ ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণের মধ্যে প্রায় ১৮ জন আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১৯ জনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ বয়সী তরুণদের আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুহার প্রায় ৪ শতাংশ বেড়েছে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. সাইফুন নাহার বলেন, আত্মহত্যার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে এমন উপকরণ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তির নাগালের বাইরে রাখা প্রয়োজন। আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দিলে তাকে দূরে ঠেলে দেওয়া বা অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
তার ভাষ্য, ওই ব্যক্তির পাশে বসে তার অনুভূতি ও সমস্যার কথা জানতে হবে। তীব্র বিষণ্নতার সময় অনেকের স্বাভাবিক কাজকর্ম ও কোনো কিছু করার আগ্রহ কমে যায়। তাই পরিবারের সদস্য ও আশপাশের মানুষকে সহানুভূতিশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রত্যেক মানুষের মানসিক চাপ সামলানোর সক্ষমতা এক নয়। প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সংকট মোকাবিলার দক্ষতা বাড়ানো যেতে পারে।
বাংলাদেশের দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩০৯ ধারায় আত্মহত্যার চেষ্টা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। এ ধারায় আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত সাধারণ কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড দেওয়ার বিধান রয়েছে।
তবে আত্মহত্যার চেষ্টাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সংকট হিসেবে দেখার দাবি জানিয়ে আসছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও আইনবিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, আত্মহত্যার চেষ্টা করা ব্যক্তি এমন এক তীব্র মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে পারেন, যখন শাস্তির ভয় তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তাই চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও সামাজিক সহায়তার মাধ্যমে তাকে সংকট থেকে বের করে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)-এর মানসিক ও শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের ডেপুটি প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর ড. মোহাম্মদ সোহেল সৌমিক বলেন, আত্মহত্যার চেষ্টা কোনো ক্রিমিনাল অফেন্স নয়; এটি একটি মানসিক সমস্যা। বাংলাদেশের প্রচলিত ১৮৬০ সালের আইনে বিষয়টি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হলেও দেশে এ আইনের প্রয়োগের নজির নেই।
তিনি জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ করে বাংলাদেশের বাস্তবতার আলোকে আত্মহত্যার চেষ্টা প্রতিরোধে একটি নীতিমালার খসড়া তৈরি করে সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রচলিত আইন বাতিল করে নতুন নীতিমালার মাধ্যমে আত্মহত্যা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
তার মতে, ব্রিটিশ উপনিবেশের অধীনে থাকা অনেক দেশ এরই মধ্যে এ ধরনের আইন বাতিল করেছে। শ্রীলঙ্কাও কয়েক বছর আগে আইনটি বাতিল করে ইতিবাচক ফল পেয়েছে।
আঁচল ফাউন্ডেশনের সভাপতি তানসেন রোজ বলেন, আত্মহত্যাকে ঘিরে সামাজিক ও ধর্মীয় নানা ধরনের নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। এর সঙ্গে আইনগত শাস্তির বিষয় যুক্ত হওয়ায় আত্মহত্যার চেষ্টা করা ব্যক্তির ওপর সামাজিক চাপ আরও বাড়তে পারে।
তার দাবি, আত্মহত্যার চেষ্টা করা ব্যক্তিকে রোগী হিসেবে বিবেচনা করে চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে আত্মহত্যার চেষ্টা করা ব্যক্তিদের চিকিৎসা নিতে গিয়ে নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ইনসাইট ফর চেঞ্জ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার নওফেল জামির বলেন, আত্মহত্যা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। ধর্মীয় ও আইনগত দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যকেও গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। সামাজিক ট্যাবু ও প্রচলিত ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা বাড়ানো জরুরি।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, আত্মহত্যাকে অপরাধ হিসেবে দেখার কারণে এর সঙ্গে জড়িত সামাজিক স্টিগমা আরও বাড়ছে। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে কমিউনিটি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে সচেতনতা কম।
তিনি বলেন, টেলিকাউন্সেলিংসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। একজন মানুষ সংকটে পড়লে কোথায় এবং কার কাছ থেকে সহায়তা নিতে পারবেন—এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা তৈরি করা জরুরি। আত্মহত্যা প্রতিরোধকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আইনগত কাঠামো তৈরিতেও সরকার কাজ করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা কমাতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, সরকার, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আত্মহত্যাকে শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা কিংবা পারিবারিক সমস্যা হিসেবে দেখলে এর মূল কারণগুলো আড়ালে থেকে যায়।
তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত আলোচনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং সুবিধা, সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, সংকটে থাকা ব্যক্তিকে দ্রুত সহায়তা এবং সামাজিক কলঙ্ক কমানোর উদ্যোগ—এসবকে আত্মহত্যা প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
আজ ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস-২০২৬। এবারের প্রতিপাদ্য—‘আত্মহত্যা সম্পর্কিত ধারণার পরিবর্তন’। দিবসটি ঘিরে বিশেষজ্ঞদের আহ্বান, আত্মহত্যা নিয়ে নীরবতা ভেঙে মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সংকটে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সংস্কৃতি গড়ে তোলা।