দেশে ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের অনুমোদন বা রেজিস্ট্রেশন দেয়নি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। তবে সিঙ্গেল-ডেকার হিসেবে নিবন্ধন নেওয়ার পর অনুমোদন ছাড়াই বাসের বডি পরিবর্তন করে ডাবল-ডেকার স্লিপারে রূপান্তরের ঘটনা ঘটছে। এমন ৪১টি বাসের রেজিস্ট্রেশন ইতোমধ্যে স্থগিত করেছে বিআরটিএ।
হাইকোর্টের একটি রিটের নির্দেশনার পর বিআরটিএর গঠিত তিন সদস্যের কারিগরি কমিটির প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিআরটিএর ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত কমিটি বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) প্রতিবেদন জমা দেয়।
অনুমোদনহীন স্লিপার এসি বাস সড়কে চলাচলের বৈধতা নিয়ে ২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুহাম্মদ হুজ্জাতুল ইসলাম খান হাইকোর্টে রিট করেন।
রিটের শুনানি শেষে ওই বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি আদালত রুল জারি করেন। পরে রিটকারী এ বিষয়ে আরেকটি আবেদন করলে আদালত ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের বিষয়ে একটি স্বাধীন কারিগরি কমিটি গঠনের নির্দেশনার কথা জানান।
আদালতের নির্দেশনা পাওয়ার পর বিআরটিএ তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। সেই কমিটিই দেশের ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের বর্তমান পরিস্থিতি, অনুমোদন ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা নিয়ে পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দিয়েছে।
বিআরটিএ পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মোহাম্মদ শহীদুল্লার নেতৃত্বে গঠিত কমিটিতে সদস্য হিসেবে ছিলেন উপপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) এ. এস. এম কামরুল হাসান এবং সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. মঈনুল ইসলাম।
কমিটিকে কয়েকটি বিষয় পর্যালোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল দেশে বিআরটিএ অনুমোদিত ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের সংখ্যা নির্ধারণ, অনুমোদনহীন বাসের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থা পর্যালোচনা এবং অনুমোদিত বাস থাকলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ চিহ্নিত করা।
এ ছাড়া বর্তমানে চলাচলরত ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের অবস্থা, অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে এ ধরনের বাসের জন্য জাতীয় গাইডলাইন বা নীতিমালার প্রয়োজনীয়তাও খতিয়ে দেখে কমিটি।
কমিটির পর্যালোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—বিআরটিএ এখন পর্যন্ত কোনো ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের অনুমোদন বা রেজিস্ট্রেশন দেয়নি।
তবে বিআরটিএর ডাটাবেজে ডাবল-ডেকার বাস হিসেবে নিবন্ধিত মোট ৮২৯টি বাসের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব বাস স্লিপার বাস নয়।
অন্যদিকে, সিঙ্গেল-ডেকার বাস হিসেবে নিবন্ধন নেওয়ার পর কিছু মালিক অনুমোদন ছাড়াই গাড়ির বডি পরিবর্তন করে সেগুলোকে ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসে রূপান্তর করেছেন। এ ধরনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ৪১টি বাসের রেজিস্ট্রেশন স্থগিত করা হয়েছে।
শুধু রেজিস্ট্রেশন স্থগিত নয়, সড়কে চলাচলরত অননুমোদিত স্লিপার বাসের বিরুদ্ধেও অভিযান চালাচ্ছে বিআরটিএ।
কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সড়কে চলাচলরত তিনটি স্লিপার বাসের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এ ছাড়া অননুমোদিত ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিভিন্ন সময়ে পুলিশ বিভাগকে চিঠিও দিয়েছে বিআরটিএ।
সিঙ্গেল-ডেকার হিসেবে নিবন্ধিত কোনো বাস পরবর্তী সময়ে ডাবল-ডেকার স্লিপারে রূপান্তর করে ফিটনেস নবায়নের জন্য বিআরটিএতে আনা হলে সেটির ফিটনেস নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোটরযানের রেজিস্ট্রেশন স্থগিত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সড়কে চলাচলরত এসব অননুমোদিত ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসকে রুট পারমিটও দেওয়া হচ্ছে না।
কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের জন্য কোনো নির্দিষ্ট গাইডলাইন বা নীতিমালা নেই। এ কারণে বিআরটিএ এ ধরনের মোটরযানের অনুমোদন বা রেজিস্ট্রেশন দেয় না।
বর্তমান সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ এবং সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২ অনুযায়ী বর্তমানে সিঙ্গেল-ডেকার বাসের অনুমোদন ও রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হচ্ছে।
ফলে অনুমোদিত ডাবল-ডেকার স্লিপার বাস না থাকায় এ ধরনের বাসের জন্য আলাদা নিরাপত্তা যাচাইয়ের বিষয়টিও বর্তমানে প্রযোজ্য হয়নি বলে জানিয়েছে কমিটি।
ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে একটি জাতীয় গাইডলাইন বা নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ভবিষ্যতে দেশে ডাবল-ডেকার স্লিপার বাস চালুর অনুমতি দেওয়া হলে যাত্রীদের নিরাপত্তা, গাড়ির কাঠামো, অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমনসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা জরুরি। তার আগে অনুমোদনহীনভাবে বডি পরিবর্তন করে তৈরি করা এসব বাসের বিরুদ্ধে নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।