নিজস্ব প্রতিবেদক:
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত বা চাকরি থেকে অপসারণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের ‘আপিল ও সালিশ কমিটি’র মাধ্যমে বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বোর্ডের চূড়ান্ত অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
আদালত বলেছেন, শিক্ষা বোর্ডের চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে কোনো বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত বা অপসারণের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারবে না। একই সঙ্গে যথাযথভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কিংবা আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কোনো শিক্ষককে শাস্তি দেওয়া বেআইনি।
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার গচিহাটা কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আবুল মনসুরকে বরখাস্তের ঘটনায় দায়ের করা একটি রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে এ রায় দেন হাইকোর্ট। ‘মোহা. আখতারুজ্জামান বনাম রাষ্ট্র এবং অন্যান্য’ মামলায় গত ৭ জুলাই বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী ও বিচারপতি দিহিদার মাসুম কবিরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রায় দেন। ৩০ আগস্ট রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়। রায়টি লিখেছেন বিচারপতি দিহিদার মাসুম কবির।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর গচিহাটা পল্লী একাডেমির প্রধান শিক্ষিকা জাকিয়া বেগম কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবুল মনসুরের বিরুদ্ধে অনৈতিক আচরণের অভিযোগ করেন।
অভিযোগে বলা হয়, ওইদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আবুল মনসুর জাকিয়া বেগমের বাড়িতে যান। মেয়ের একটি বই ফেরত দেওয়ার কথা বলে প্রথমে তিনি বাড়িতে প্রবেশ করেন। পরে আবার সেখানে গিয়ে ছোট মেয়ের পাশে বসা এবং তার মাথা ও হাতে স্পর্শ করার অভিযোগ ওঠে। তৃতীয়বারও তিনি বাড়িতে প্রবেশের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ নভেম্বর কলেজের অধ্যক্ষ শিক্ষক আবুল মনসুরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। আদালতের নথিতে দেখা যায়, ওই নোটিশে অভিযোগের তারিখে অসঙ্গতি ছিল এবং তিন দিনের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়।
পরদিন দেওয়া জবাবে শিক্ষক বাড়িতে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও তার বিরুদ্ধে আনা অসৎ উদ্দেশ্য ও অনৈতিক আচরণের অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তার জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় ২৯ নভেম্বর গভর্নিং বডি পাঁচটি নির্দিষ্ট প্রশ্ন উল্লেখ করে তাকে দ্বিতীয় দফায় শোকজ করে। ৬ ডিসেম্বর দেওয়া জবাবেও শিক্ষক অভিযোগ অস্বীকার করেন।
এরপর গভর্নিং বডির সভাপতি ও কলেজের প্রতিষ্ঠাতা মোহা. আখতারুজ্জামানের মৌখিক বা মুঠোফোনের নির্দেশে ৭ ডিসেম্বর অধ্যক্ষ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, মাত্র ছয় দিনের মধ্যে কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।
তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০১৫ সালের ৩১ জানুয়ারি গভর্নিং বডির সভায় আবুল মনসুরকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরদিন, অর্থাৎ ১ ফেব্রুয়ারি থেকে সিদ্ধান্তটি কার্যকর দেখানো হয়।
বরখাস্তের সিদ্ধান্ত অনুমোদনের জন্য ২০১৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটির কাছে পাঠানো হয়। তবে ২০ এপ্রিলের সভায় কমিটি গভর্নিং বডির সিদ্ধান্ত অনুমোদন না করে তা নামঞ্জুর করে।
একই সঙ্গে শিক্ষক আবুল মনসুরকে বকেয়া বেতন-ভাতাসহ চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়। ২৮ মে এ সিদ্ধান্তের কথা কলেজ কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়।
কলেজ কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন করলেও শিক্ষা বোর্ড জানায়, আপিল ও সালিশ কমিটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার কোনো আইনগত সুযোগ নেই।
পরে বোর্ডের সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও গভর্নিং বডির সভাপতি মোহা. আখতারুজ্জামান। প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত রুল জারি করেন এবং বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর স্থগিতাদেশ দেন।
মামলার চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল খারিজ করে দেন এবং আগে দেওয়া স্থগিতাদেশও বাতিল করেন।
রায়ে আদালত বলেন, কোনো বেসরকারি কলেজ শিক্ষককে বরখাস্ত বা অপসারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রবিধানমালা অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত শিক্ষককে অভিযোগের বিষয়ে যথাযথভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, কারণ দর্শানোর যথাযথ সুযোগ না দিয়ে অথবা কেবল মৌখিক কিংবা মুঠোফোনের নির্দেশের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি গঠন করে তড়িঘড়ি কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত করা আইনগত কর্তৃত্বের বাইরে। এ ধরনের পদক্ষেপ বেআইনি।
আদালত আরও স্পষ্ট করেন, আপিল ও সালিশ কমিটির পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং শিক্ষা বোর্ডের চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে গভর্নিং বডি কোনো শিক্ষককে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারে না।
মামলাটি দীর্ঘদিন আদালতে বিচারাধীন থাকায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ইতোমধ্যে অবসরের নির্ধারিত বয়সে পৌঁছে গেছেন। ফলে তাকে আগের পদে পুনর্বহালের পরিবর্তে আর্থিক ও অবসরকালীন সুবিধা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
রায়ে বলা হয়েছে, বরখাস্তের তারিখ থেকে অবসরে যাওয়ার তারিখ পর্যন্ত আবুল মনসুর যে বেতন-ভাতা ও চাকরিসংক্রান্ত সুবিধা পাওয়ার অধিকারী ছিলেন, তা তাকে পরিশোধ করতে হবে। পাশাপাশি প্রযোজ্য পেনশন ও অবসরোত্তর সুবিধাও দিতে হবে।
শিক্ষা বোর্ড ও কলেজ কর্তৃপক্ষকে আদালতের এই নির্দেশ দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রায়ে মূলত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক বরখাস্তের ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার এবং শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতাকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।