কেনাকাটার বিল পরিশোধ সহজ করতে চালু হয়েছিল ‘বাংলা কিউআর’।
কিন্তু এখন সেই কিউআর কোডই হয়ে উঠেছে নগদ টাকা তোলার বিকল্প মাধ্যম।
অভিযোগ উঠেছে, অনেক মার্চেন্ট কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রি না করেই বাংলা কিউআরের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন এবং বিনিময়ে নগদ অর্থ দিয়ে দিচ্ছেন।
ধরুন, একজন গ্রাহক কোনো দোকান থেকে কিছুই কিনলেন না। তিনি কিউআর কোডে ৩০ হাজার টাকা পাঠালেন, আর দোকানদার তাঁকে নগদ ৩০ হাজার টাকা দিয়ে দিলেন। বিনিময়ে দোকানদারকে সামান্য কিছু টাকা দিলেই হচ্ছে।
এতে গ্রাহকের লাভ—এমএফএসের নিয়মিত ক্যাশ আউট ফি দিতে হচ্ছে না।
আর দোকানদারেরও লাভ—কোনো পণ্য বিক্রি না করেই অতিরিক্ত আয় হচ্ছে।
কিন্তু এর বড় প্রভাব পড়ছে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএসের এজেন্টদের ওপর।
দেশে এমএফএসের প্রায় ২০ লাখ এজেন্ট রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব এজেন্টের মাধ্যমেই প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছেছে বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো সেবা।
এজেন্ট থেকে ক্যাশ আউট করতে গ্রাহককে প্রতি হাজারে প্রায় ১২ টাকা ৯০ পয়সা থেকে ১৮ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত ফি দিতে হয়। ফলে ৩০ হাজার টাকা তুললে সর্বনিম্ন প্রায় ৩৮৭ টাকা ফি দিতে হতে পারে।
অন্যদিকে, বাংলা কিউআরের মাধ্যমে মার্চেন্ট থেকে টাকা তুললে অনেক ক্ষেত্রে এই খরচ থাকছে না।
আর এখানেই তৈরি হয়েছে বড় সমস্যা।
বাংলা কিউআরকে ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার কথা থাকলেও, এর মাধ্যমে পণ্য বা সেবা ছাড়াই নগদ টাকা লেনদেন হচ্ছে। ফলে একদিকে এমএফএসের এজেন্ট ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে অবৈধ অর্থ লেনদেনের ঝুঁকি।
কারণ এমএফএসে ক্যাশ আউটের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত সীমা ও বিভিন্ন বিধিনিষেধ রয়েছে। কিন্তু বাংলা কিউআরের মাধ্যমে একই ধরনের নগদ উত্তোলনে সেই সীমাবদ্ধতা নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই থেকে লেনদেনে বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশজুড়ে প্রায় ৩৫ লাখ মার্চেন্ট কিউআর কোড স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩৭ কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে কিউআর কোডে।
তবে এই ব্যবস্থার অপব্যবহারের কিছু অস্বাভাবিক ঘটনাও সামনে এসেছে।
উদাহরণ হিসেবে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক গ্রাহক মাত্র পাঁচ দিনে দুটি ব্যাংকের কিউআর কোড ব্যবহার করে প্রায় ৩৬ লাখ ৩৯ হাজার টাকা লেনদেন করেছেন। আবার নেত্রকোনার আরেক গ্রাহক মাত্র দুই দিনে বিভিন্ন দোকানের বাংলা কিউআর ব্যবহার করে প্রায় ৪০ লাখ টাকা লেনদেন করেছেন।
এ ধরনের অস্বাভাবিক লেনদেন নিয়ে ইতোমধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো।
অন্যদিকে, আগামী অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণে মার্চেন্টদের খরচ শূন্য করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে গ্রাহক ও মার্চেন্ট—দুই পক্ষের জন্যই কিউআর ব্যবহার করে নগদ লেনদেন আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এতে সরকার রাজস্ব হারাতে পারে, এমএফএসের এজেন্ট ইকোসিস্টেম দুর্বল হতে পারে এবং অবৈধ অর্থ লেনদেনের সুযোগ বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য বলছে, বাংলা কিউআর চালুর মূল উদ্দেশ্য নগদ টাকার ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো। তবে এই সুবিধার অপব্যবহার হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
প্রশ্ন হলো—
ডিজিটাল লেনদেন সহজ করতে চালু হওয়া বাংলা কিউআর কি শেষ পর্যন্ত অবৈধ ক্যাশ আউটের নতুন দরজা হয়ে উঠছে?
এখন নজর বাংলাদেশ ব্যাংকের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।