মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ ছড়িয়ে বিদেশি ক্রেতা ও ব্যাংকগুলোকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ করেছে দেশের বস্ত্র ও পোশাক খাতের বড় শিল্পগোষ্ঠী নোমান গ্রুপ। গ্রুপটির দাবি, এসব অভিযোগের প্রভাবে কয়েকটি ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত হয়েছে, পাশাপাশি কিছু ব্যাংক তাদের ঋণ ও এলসি সীমা কমিয়ে দিয়েছে। এতে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের পাশাপাশি ৮০ হাজারের বেশি কর্মীর কর্মসংস্থানও ঝুঁকিতে পড়ছে বলে দাবি প্রতিষ্ঠানটির।
এ বিষয়ে নোমান গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান জাবের অ্যান্ড জোবায়ের ফেব্রিক্স লিমিটেড সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির চিঠিতে কাজল সরকার, হারুন অর রশিদ (বডি বিল্ডার হারুন), আনোয়ার হোসেন, হেলাল উদ্দিন ও দেলোয়ার হোসেনসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, তফসিলি ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), তিতাস গ্যাস এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের বাংলাদেশ কার্যালয়ে অভিযোগ দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
নোমান গ্রুপের দাবি, এসব অভিযোগের কারণে ওয়ালমার্ট, আইকিয়া, এইচঅ্যান্ডএম, কে-মার্ট, টার্গেট ও লিডলের মতো আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কেউ কেউ ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত করেছেন। আরও কয়েকশ কোটি টাকার সম্ভাব্য ক্রয়াদেশ নিয়েও ক্রেতাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
নোমান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ব্যক্তিগত অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে ব্যাংকগুলো যাতে ঋণ বা এলসি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত না নেয়, সে বিষয়েই বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রতিকার চাওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, অভিযোগগুলোর পর কয়েকটি ব্যাংক গ্রুপটির এলসি সীমা কমিয়েছে। এর মধ্যে একটি ব্যাংক ১০০ কোটি টাকার এলসি সীমা কমিয়ে ৫০ কোটি টাকা করেছে বলেও তিনি দাবি করেন।
নুরুল ইসলামের ভাষ্য, এতে ব্যবসা পরিচালনায় চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি গ্রুপের ৮০ হাজারের বেশি কর্মীর কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
নোমান গ্রুপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে হারুন অর রশিদ ও তার ভাই আনোয়ার হোসেনকে ওয়েস্টেজ ও সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হয়। ব্যবসার মূলধনের ঘাটতি থাকায় গ্রুপের চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত হিসাব থেকে হারুনকে বিভিন্ন সময়ে মোট ৯৩ লাখ টাকা ধার দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
২০২০ সালের নভেম্বরে অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগ ওঠার পর তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়। এরপর থেকেই বিরোধের সূত্রপাত বলে দাবি নোমান গ্রুপের।
প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, পরবর্তীতে হুমকির অভিযোগে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়। ওই মামলায় একই বছরের ৩০ ডিসেম্বর হারুনকে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে গ্রুপটি।
এ ছাড়া আনোয়ার হোসেন হাইকোর্টে রিট পিটিশন করেন এবং কাজল সরকার গাজীপুরে দেওয়ানি মামলা ও ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৭ ধারায় মামলা করেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ১০৭ ধারার মামলাটি সম্প্রতি নিষ্পত্তি হয়েছে বলেও দাবি করেছে নোমান গ্রুপ।
নোমান গ্রুপের অভিযোগ, তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে একের পর এক অভিযোগ দেওয়ার পাশাপাশি কিছু নামসর্বস্ব সংবাদমাধ্যমে ভিত্তিহীন প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্নের চেষ্টা করা হচ্ছে।
এর বিরুদ্ধে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা এবং কাজল সরকারের বিরুদ্ধে সিআর মামলা করার কথাও জানিয়েছে গ্রুপটি।
নোমান গ্রুপের অভিযোগ অস্বীকার করে কাজল সরকার বলেন, তাদের সঙ্গে তার মূল বিরোধ জমি নিয়ে। তার দাবি, গাজীপুরের টঙ্গীর পাগাড় এলাকায় প্রায় ৭০ বিঘা জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ রয়েছে এবং এ নিয়ে আদালতে একাধিক মামলা বিচারাধীন।
কাজল সরকারের ভাষ্য, মামলা চলমান থাকা অবস্থায় ওই জমি ঋণের জামানত হিসেবে ব্যবহারের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অবহিত করা তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এ কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অভিযোগ করেছেন বলে জানান তিনি।
তিতাস গ্যাসের কাছে গ্যাস চুরির অভিযোগ করার কথাও স্বীকার করেন কাজল। তবে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি—তাকে এমনটাই জানানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ কিংবা সুপারিশের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ দেওয়ার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেয় না।
তার ভাষ্য, ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করেই ঋণ ও এলসি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ঋণগ্রহীতার সম্পদ, আর্থিক সক্ষমতা এবং ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য যাচাই করেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা।
নোমান গ্রুপের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রুপটির বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৮০ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করছেন।
গ্রুপটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান জাবের অ্যান্ড জোবায়ের ফেব্রিক্স লিমিটেড একাধিকবার জাতীয় রপ্তানি ট্রফি (গোল্ড) অর্জন করেছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের রপ্তানি ও শিল্প খাতের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে জাবের অ্যান্ড জোবায়ের ফেব্রিক্স লিমিটেড।