নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে গিয়ে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় ও সমন্বিত ভূমিকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহ এবং জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপ পৃথকভাবে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। দুই বৈঠকেই দীর্ঘদিন ধরে চলমান রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের পথ নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে বাংলাদেশ বছরের পর বছর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। তবে এই সংকটের সমাধান বাংলাদেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ অব্যাহত রাখার মধ্যে নয়; বরং রোহিঙ্গাদের নিজেদের ভূমিতে নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্যেই এর স্থায়ী সমাধান রয়েছে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে বাস্তবসম্মতভাবে এগিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মিয়ানমারে এমন একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দেন তিনি, যেখানে রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে নিজ দেশে ফিরতে পারেন।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বৈঠকে বলা হয়, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় শুধু ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা যথেষ্ট নয়। প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি এবং সংকটের মূল কারণগুলোর সমাধানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকার প্রশংসা করেন বারহাম সালেহ। সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
জুলি বিশপের সঙ্গে আলোচনাতেও রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পর সংকটটি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়। এরপর একাধিকবার প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নিরাপত্তা ও অনুকূল পরিবেশের ঘাটতির কারণে তা কার্যকরভাবে এগোয়নি। বর্তমানে কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করছেন বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা। এতে বাংলাদেশের ওপর মানবিক সহায়তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও অন্যান্য চাপও বাড়ছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রী এর আগে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগে, মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট উজ. হুসেইন মোহামেদ লতিফ, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান, হাইতির প্রধানমন্ত্রী আলিক্স দিদিয়ের ফিলস-আইমে এবং বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
সফরসূচি অনুযায়ী, ২৩ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতব্য ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠকে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। পরে ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে ও স্পেনের আয়োজনে বৈশ্বিক বৈষম্য সংকট মোকাবিলা বিষয়ক একটি সভায় বক্তব্য দেবেন তিনি।
দিনের শেষভাগে জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সভায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তার।
আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘে এটিই হবে তার প্রথম ভাষণ। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, তিনি বাংলায় বক্তব্য দেবেন।