ডিজেলের দাম বাড়ার অজুহাতে ১০ টাকার ভাড়া ২০, ২০ টাকার ভাড়া ৩০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ; নতুন ভাড়া নির্ধারণ কিলোমিটারে ১৭ পয়সা
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর বাসভাড়া সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে সরকার। তবে নতুন ভাড়ার প্রজ্ঞাপন এখনো জারি হয়নি। এরই মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন রুটে আগের তুলনায় ৫০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।
যাত্রীদের অভিযোগ, কোনো কোনো রুটে ১০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ২০ টাকা, আবার ২০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৩০ টাকা। চালকদের পক্ষ থেকে ডিজেলের দাম বাড়ার কথা বলা হলেও বাড়তি ভাড়া আদায়ের অনুমোদনসংক্রান্ত কোনো সরকারি কাগজ দেখাতে পারেননি তারা।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড ও রুট ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
সাভার থেকে টেকনিক্যাল এলাকায় নিয়মিত যাতায়াত করেন ফারজানা আহমেদ। তিনি বলেন, আগে এ পথে ২০ টাকা ভাড়া দিলেও এখন দিতে হচ্ছে ৩০ টাকা। অর্থাৎ একবারেই ভাড়া ৫০ শতাংশ বেড়েছে। একইভাবে ইসলামপুর যেতে আগে ৬০ টাকা লাগলেও এখন ৮০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। গত দুই দিন ধরে তেলের দাম বৃদ্ধির কথা বলে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
বলিয়াপুর থেকে প্রতিদিন টেকনিক্যাল মোড়ে আসেন শিক্ষার্থী মো. আশফাক রহমান। তার অভিযোগ, আগে যেখানে ১০ টাকা ভাড়া নেওয়া হতো, মঙ্গলবার সেখানে ২০ টাকা নেওয়া হয়েছে।
আশফাক বলেন, চালকেরা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণ দেখিয়ে বাড়তি টাকা নিচ্ছেন। শিক্ষার্থী ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য এভাবে ভাড়া বেড়ে যাওয়া বড় চাপ তৈরি করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
যাত্রীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১০ টাকা থেকে ২০ টাকা হলে ভাড়া শতভাগ বেড়ে যায়। ২০ টাকা থেকে ৩০ টাকা হলে বৃদ্ধি ৫০ শতাংশ। আর ৬০ টাকা থেকে ৮০ টাকা হলে ভাড়া বাড়ে ৩৩ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ নতুন সরকারি ভাড়া কার্যকর হওয়ার আগেই কিছু রুটে পুরোনো নির্ধারিত ভাড়ার তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
তবে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বাসচালকেরা। শুভযাত্রা পরিবহনের চালক মো. তুহিন মিয়া বলেন, তাদের ভাড়া বাড়েনি। তবে ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতিদিন আপ-ডাউন ট্রিপে জ্বালানি বাবদ প্রায় ২ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। তিনি বলেন, যাত্রীদের কাছে বাড়তি ভাড়া চাইলে অনেক সময় ঝামেলা তৈরি হয়। সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দিলে তখন সেটি কার্যকর করা হবে।
এর মধ্যেই ডিজেলচালিত বাসের ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দূরপাল্লা, মহানগর ও শহরের বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ১৭ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে নতুন ভাড়ার সরকারি প্রজ্ঞাপন এখনো প্রকাশিত হয়নি।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রচলিত হিসাবে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে ১ টাকা বাড়লে বাসভাড়া কিলোমিটারে প্রায় ১ পয়সা বাড়ানোর হিসাব করা হয়। এবার ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব দেয়। পরে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে তা কমিয়ে ১৭ পয়সা নির্ধারণ করা হয়।
এর আগে ২১ সেপ্টেম্বর বিআরটিএ সদর দপ্তরে বাসভাড়া পুনর্নির্ধারণ নিয়ে বাস মালিকদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মালিকপক্ষ কিলোমিটারপ্রতি অন্তত ৪০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানায়। আলোচনার পর ২০ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করা হলেও শেষ পর্যন্ত মন্ত্রণালয় ১৭ পয়সা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয়।
নতুন ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে ৫২ আসনের বড় বাস এবং ৩০ আসনের মিনিবাসকে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে। তবে দূরপাল্লার অনেক বাসে যাত্রীদের তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য আসনসংখ্যা কম রাখা হয়। ফলে এসব বাসে আসনপ্রতি হিসাব ভিন্ন হওয়ায় ভাড়াতেও পার্থক্য দেখা দিতে পারে।
বিআরটিএ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দূরপাল্লা ও নগরীর বিভিন্ন রুটের দূরত্ব বিবেচনায় নিয়ে নতুন ভাড়ার বিস্তারিত তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তালিকা প্রকাশে আরও এক থেকে দুই দিন সময় লাগতে পারে।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বর্তমানে বড় বাসের কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা। ১৭ পয়সা বৃদ্ধির পর তা হবে ২ টাকা ৭০ পয়সা।
মিনিবাসের বর্তমান কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ৪২ পয়সা থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ২ টাকা ৫৯ পয়সায়।
অন্যদিকে দূরপাল্লার ৫২ আসনের বাসে বর্তমানে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা। নতুন হার কার্যকর হলে সেটি হবে ২ টাকা ৪০ পয়সা।
গত ২০ সেপ্টেম্বর রাতে ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করে সরকার। এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলেও ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। তখন বাসের কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ১১ পয়সা বাড়ানো হয়।
এবারও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব বাসভাড়ায় পড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করছেন যাত্রীরা। তালহা জনি নামে এক যাত্রী বলেন, তেলের দাম বাড়লে বাসভাড়া আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার ভাষ্য, আগে শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক কম ভাড়ায় চলাচল করতে পারলেও এখন অল্প দূরত্বের জন্যও সর্বনিম্ন ১০ টাকা দিতে হয়। নতুন করে ভাড়া বাড়লে সাধারণ মানুষের ব্যয় আরও বাড়বে।
তার মতে, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির পুরো চাপ শেষ পর্যন্ত যাত্রীদের ওপর গিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সরকার নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হলে সংশ্লিষ্ট বাসের রুট পারমিট বাতিল করা হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
মঙ্গলবার দুপুরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভাড়া সমন্বয়ের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বাস মালিকদের রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন ব্যয়ের বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। সব দিক পর্যালোচনা করেই কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, জ্বালানির বৈশ্বিক ও সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমন্বয় করতে হয়। তবে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি আদায় করলে সংশ্লিষ্ট বাসের রুট পারমিট বাতিল করা হবে।
রেলের ভাড়া আপাতত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেই বলেও জানান তিনি। লঞ্চের ভাড়া বাড়ানোর দাবি রয়েছে এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান মন্ত্রী।
সরকারের নির্ধারিত ১৭ পয়সা ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীর দাবি, তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ৮ পয়সা এবং নগর পরিবহনে ১০ পয়সা বাড়ালেই জ্বালানি তেলের বাড়তি খরচ সমন্বয় করা সম্ভব।
তিনি অভিযোগ করেন, ভাড়া পুনর্নির্ধারণের আলোচনায় যাত্রীদের প্রতিনিধিত্ব যথাযথভাবে থাকছে না। বাস ও লঞ্চ মালিকদের সঙ্গে সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর একাধিক বৈঠক হলেও সাধারণ যাত্রীদের মতামত নেওয়া হচ্ছে না।
মোজাম্মেল হক চৌধুরীর ভাষ্য, ভাড়া বাড়ানোর যৌক্তিকতা বোঝাতে পরিচালন ব্যয় কতটা বেড়েছে এবং ঠিক কত পয়সা বাড়ালে সেই ব্যয় সমন্বয় হবে—এ বিষয়ে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন। তার দাবি, ভাড়া নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় যাত্রীদের অংশগ্রহণ না থাকায় শেষ পর্যন্ত এর আর্থিক চাপ সাধারণ মানুষের ওপরই পড়ে।