ভারত থেকে ইলিশ আমদানির জন্য দেওয়া ১০৩টি অনাপত্তি সনদ (এনওসি) বাতিল করেছে মৎস্য অধিদপ্তর। এর ফলে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় ইলিশ আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন করে আর ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
মৎস্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনকের স্বাক্ষরিত চিঠিতে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) ১০৩টি এনওসি বাতিলের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর বেনাপোল স্থলবন্দরের সংশ্লিষ্ট কোয়ারেন্টিন ও মৎস্যমান নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানানো হয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও এনওসি বাতিলের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
বেনাপোল স্থলবন্দর সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশে ১ হাজার ৭৩৯ দশমিক ৫০ টন ইলিশ আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
এর মধ্যে বুধবার পর্যন্ত বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ৫৩৫ টন ইলিশ দেশে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে। এর আগে ২০ জুলাই থেকে ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বেনাপোল দিয়ে ৫৫৩ টন ইলিশ আমদানির তথ্যও বন্দরসংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে এসেছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আমদানি করা ইলিশের চালানগুলো ভারতের গুজরাটের ভারুচ এলাকা থেকে এসেছে।
দেশে উৎপাদিত ইলিশের পাশাপাশি রুই, কাতলা, আইড় ও বোয়ালের মতো দেশীয় মাছের আমদানি কমিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর সুপারিশ করে আসছে মৎস্য অধিদপ্তর।
মন্ত্রণালয়ে পাঠানো বিভিন্ন চিঠিতে দেশের মৎস্য খাতের অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরে দেশীয় মাছ আমদানি নিয়ন্ত্রণের পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়েছে।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মোট ৫০ দশমিক ১৮ লাখ টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ দশমিক ০৬ শতাংশ বা ১৮ দশমিক ৬০ লাখ টন ছিল কার্পজাতীয় মাছ।
এ ছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৯০ হাজার ৬২০ টন মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে ৬ হাজার ১৪৪ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১২ শতাংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে দেশীয় মাছের আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিধির বিষয়টিও সামনে এসেছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) আওতাধীন GATT-এর ১১ নম্বর অনুচ্ছেদ সাধারণভাবে শুল্ক, কর বা অন্যান্য চার্জ ছাড়া আমদানির ওপর কোটা, লাইসেন্সসহ পরিমাণগত বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করেছে। WTO-এর ব্যাখ্যায় এ ধরনের নিষেধাজ্ঞার ওপর সাধারণ নিষেধাজ্ঞা থাকলেও নির্দিষ্ট কিছু ব্যতিক্রমের সুযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে কৃষি ও মৎস্যপণ্যের ক্ষেত্রে GATT-এর Article XI:2(c)-এ কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আমদানি নিয়ন্ত্রণের ব্যতিক্রমের কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে এ ধরনের ব্যতিক্রম প্রয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণের প্রয়োজন হয়।
ফলে ভারতীয় ইলিশ আমদানির এনওসি বাতিলের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিধির সঙ্গে এর সামঞ্জস্যের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
হঠাৎ এনওসি বাতিল হওয়ায় আমদানিকারকদের একটি অংশ আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ইতোমধ্যে ভারতে কেনা ও মজুত করা ইলিশের চালান নতুন সিদ্ধান্তের কারণে আটকে যেতে পারে। এতে মাছ ফেরত পাঠানোসহ আমদানি-সংক্রান্ত বিভিন্ন খরচের বোঝা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের সিদ্ধান্তের ফলে আপাতত বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় ইলিশের নতুন কোনো চালান প্রবেশের সুযোগ থাকছে না। ফলে দেশে আমদানি করা ইলিশের সরবরাহে এর কী প্রভাব পড়ে এবং দেশীয় বাজারে এর প্রভাব কতটা হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।