দেশে দক্ষ কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং নাগরিকদের প্রযুক্তিসেবা আরও সহজলভ্য করতে প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে করনীতি, বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নতুন করে পর্যালোচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সিডার হলে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ-সিলিকন ভ্যালি প্রযুক্তি সংলাপ’-এর সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. তিতুমীর বলেন, প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতার মূল লক্ষ্য হতে হবে নাগরিক সেবার মান উন্নয়ন এবং দেশের মানুষের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করা। এ জন্য সম্ভাব্য প্রকল্প, বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এবং পরবর্তী করণীয় দ্রুত নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
‘বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য প্রযুক্তি, মেধা ও অংশীদারিত্ব’ শীর্ষক এই সংলাপের আয়োজন করে লস অ্যাঞ্জেলেসে বাংলাদেশের কনস্যুলেট জেনারেল। এতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, গবেষক, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে দেশের প্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় করেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ও সঞ্চালনা করেন কনসাল জেনারেল কাজী মুহাম্মদ জাবেদ ইকবাল। বক্তব্য দেন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম।
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ প্রতিনিধিদলে ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
সংলাপে বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের বিকাশ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বাংলাদেশে এআইয়ের সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় আরবানা-শ্যাম্পেইনের সহকারী অধ্যাপক ড. শরিফা সুলতানা, উবারের বিশিষ্ট প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম এবং এনভিডিয়ার গবেষক ড. মোস্তফা পাটোয়ারী।
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের সম্ভাবনা ও এর বিকাশ নিয়ে বক্তব্য দেন গ্লোবালফাউন্ড্রিজের ড. মাহবুব রাশেদ।
মেধা, প্রযুক্তি ও পুঁজি নিয়ে অনুষ্ঠিত প্যানেল আলোচনা সঞ্চালনা করেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ডেভিসের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাইফ ইসলাম। আলোচনায় অংশ নেন উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, ক্রিডো সেমিকন্ডাক্টরের ড. শতিল হক, এক্সোর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ড. ইউসুফ হক, মেডট্রনিকের সাবেক প্রধান নির্বাহী ও ইন্টেলের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক চেয়ারম্যান ড. ওমর ইশরাক, উল্কাসেমির সভাপতি ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমান এবং ক্লাউডএআইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা বদরুল সারওয়ার।
প্যানেল আলোচনায় গবেষণা, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, শিল্প খাতের সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে আলোচনা করা হয়।
উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, গবেষণা, শিক্ষা, স্টার্টআপ ও শিল্প খাতের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরির মাধ্যমে দেশের প্রযুক্তি খাতকে এগিয়ে নিতে সরকার কাজ করছে। বিএইআর সামিটসহ সাম্প্রতিক বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তি মেধাকে উদ্ভাবন, বিনিয়োগ এবং দক্ষ কর্মসংস্থানে রূপান্তর করা প্রয়োজন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বিশ্ব প্রযুক্তি শিল্পে বাংলাদেশি পেশাজীবীদের সাফল্যের প্রশংসা করেন। তাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ ও সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা ও উদ্ভাবন ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে শামা ওবায়েদ বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কূটনীতি পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারগুলোর একটি। কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তাসহ দেশের বিভিন্ন বাস্তব সমস্যা সমাধানেও এ ধরনের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ার এই সময়ে শিশুদের ডিজিটাল দক্ষতার পাশাপাশি মৌলিক শিক্ষায়ও শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে হবে।
তিনি শিক্ষকদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তি ও এআইয়ের যথাযথ ব্যবহার এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুসহ সব শিক্ষার্থীর কাছে মানসম্মত শিক্ষাসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি নতুন কোনো শিক্ষাপদ্ধতি বৃহৎ পরিসরে প্রয়োগের আগে তা পরীক্ষামূলকভাবে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
সংলাপ শেষে বাংলাদেশের কনস্যুলেট জেনারেল প্রতিনিধিদল ও অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে নিয়ে এসব বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে।