সময়মতো বৃষ্টি আর অনুকূল আবহাওয়া—দুইয়ে মিলে চলতি আমন মৌসুমে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা। পর্যাপ্ত বৃষ্টির পানিতে সেচের বাড়তি খরচ কমায় স্বস্তি ফিরেছে তাদের মধ্যে। তাই কাদা-পানিতে নেমে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক-কৃষাণীরা। কোথাও চলছে জমি প্রস্তুতের কাজ, কোথাও বীজতলা থেকে চারা তোলা, আবার কোথাও সারিবদ্ধভাবে চারা রোপণ।
প্রতি বছর আমন মৌসুমে সময়মতো বৃষ্টি না হওয়ায় চারা রোপণ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তে হয় কৃষকদের। তবে এবার প্রকৃতি অনেকটাই সহায় হওয়ায় সেই শঙ্কা নেই। পর্যাপ্ত বৃষ্টির পানিতে দ্রুত এগিয়ে চলছে আমনের আবাদ।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারাও বলছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণের পাশাপাশি ভালো ফলন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে কৃষকরাও লাভের মুখ দেখবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি আমন মৌসুমে রংপুর বিভাগের আট জেলায় ৬ লাখ ৬৩ হাজার ৭১৪ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব জমি থেকে ২৬ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
ইতোমধ্যে অধিকাংশ জমিতে আমনের চারা রোপণ শেষ হয়েছে। অবশিষ্ট জমিগুলোতে আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে চারা রোপণের কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
সরেজমিনে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার ফসলের মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, আমন আবাদ ঘিরে কৃষকদের কর্মচাঞ্চল্যে সরগরম হয়ে উঠেছে গ্রামবাংলার মাঠ। কোথাও ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার দিয়ে জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে। কেউ কোদাল দিয়ে জমির আইল ঠিক করছেন, আবার কেউ মই টেনে জমি সমান করছেন।
বীজতলা থেকে চারা তুলে মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছেন কৃষকেরা। এরপর দলবদ্ধভাবে সারিবদ্ধ হয়ে জমিতে চারা রোপণ করছেন কৃষাণীরা। কেউ কেউ মাথায় গামছা বেঁধে জমিতে সার ছিটাচ্ছেন।
কাদা-পানিতে কৃষকের ঘাম আর শ্রম মিশে তৈরি হচ্ছে নতুন ফসলের সম্ভাবনা। কয়েক মাস পর এসব জমিই সোনালি ধানের শীষে ভরে উঠবে—এমন প্রত্যাশাতেই পরিশ্রম করে যাচ্ছেন কৃষকরা।
তিস্তা এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম এবার দুই বিঘা জমি বর্গা নিয়ে আমন চাষ করছেন। ইতোমধ্যে জমিতে চারা রোপণও করেছেন তিনি। তবে ভালো ফলনের পাশাপাশি ধানের ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে তাঁর মধ্যে রয়েছে শঙ্কা।
নজরুল ইসলাম বলেন, ধান চাষে শ্রম ও উৎপাদন খরচ অনেক। এত পরিশ্রমের পরও বাজারে ধানের দাম উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কম থাকলে কৃষকের লাভ থাকে না, বরং লোকসানের আশঙ্কাই বেশি। তারপরও বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ কম থাকায় প্রায় ৫০ বছর ধরে কৃষিকাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি।
রংপুর সদর এলাকার কৃষক আব্দুল বারী চলতি মৌসুমে পাঁচ বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন। তাঁর মতে, এবার আবহাওয়া কৃষকদের পক্ষে রয়েছে।
তিনি জানান, পর্যাপ্ত বৃষ্টির কারণে জমিতে সেচ দিতে হয়নি। ফলে চাষাবাদের ব্যয়ও আগের তুলনায় কমেছে। আবহাওয়া এমন থাকলে এবার ভালো ফলনের আশা করছেন তিনি।
অন্যদিকে মিঠাপুকুরের রানীপুকুর এলাকার কৃষক নাসির উদ্দিন গত বোরো মৌসুমে ধানের ন্যায্য দাম পাওয়ায় এবারও আশাবাদী। সেই প্রত্যাশায় তিনি পাঁচ বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন। আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে তাঁর সব জমিতে চারা রোপণের কাজ শেষ হবে বলে জানান তিনি।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে রোপা আমন চাষের আগ্রহ রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আমন আবাদ শেষ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে রোপা আমনের আবাদ হতে পারে। প্রান্তিক কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কৃষি সেবা দিতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা নিয়মিত কাজ করছেন।
সব মিলিয়ে অনুকূল প্রকৃতি, পর্যাপ্ত বৃষ্টি এবং কৃষকের নিরলস শ্রমে উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ মাঠ এখন আমনের সম্ভাবনায় উজ্জ্বল। কৃষকদের প্রত্যাশা, ভালো ফলনের পাশাপাশি বাজারে ন্যায্য দাম মিললে এই মৌসুম তাদের ঘরে ফিরিয়ে আনবে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি ও সাফল্য।