নেত্রকোনার দুর্গাপুরে একসময় কয়লার স্তূপে ভরা একটি পরিত্যক্ত ডিপো এখন রূপ নিয়েছে সবুজে ঘেরা মাল্টার বাগানে। প্রায় এক একর পতিত জমিতে তিন উদ্যোক্তার উদ্যোগে গড়ে ওঠা এ বাগানে এবার মিলেছে আশানুরূপ ফলন। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা ও পরামর্শে গড়ে ওঠা বাগানটি এখন শুধু আয়ের উৎসই নয়, স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানেরও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
দুর্গাপুরের বিজয়পুরের চীনামাটির পাহাড় ও পর্যটন এলাকার কাছেই ছিল পরিত্যক্ত কয়লার ডিপোটি। দীর্ঘদিন ব্যবহারের বাইরে পড়ে থাকা ওই জমিকে কাজে লাগানোর চিন্তা থেকেই বাগান তৈরির উদ্যোগ নেন মামা-ভাগনেসহ তিন উদ্যোক্তা।
কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে শুরু হয় মাল্টা চাষ। প্রথমে কৃষি অফিসের সহযোগিতায় বিনামূল্যে পাওয়া যায় ৩০০টি চারা। পরে আরও ২০০টি চারা সংগ্রহ করে প্রায় এক একর জমিতে বারি-৩ ও ভিয়েতনামী জাতের মাল্টার বাগান গড়ে তোলা হয়।
চারা রোপণের পর ফলন পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রায় তিন বছর। নিয়মিত পরিচর্যা, শ্রম ও বিনিয়োগের পর এবার গাছগুলোতে দেখা দিয়েছে আশানুরূপ ফলন। বাগানের প্রায় প্রতিটি গাছেই এখন ঝুলছে সবুজ রঙের রসালো মাল্টা। মাল্টার পাশাপাশি সাথি ফসল হিসেবে রয়েছে লেবু ও বরইগাছ।
উদ্যোক্তা রনি মিত্র বলেন, তাদের বাগানের বারি-৩ ও ভিয়েতনামী জাতের মাল্টা স্বাদে মিষ্টি ও রসালো। বিজয়পুরের পর্যটন এলাকার কাছে হওয়ায় বাগানটি দেখতে আসা পর্যটকদের কেউ কেউ সরাসরি গাছ থেকে ফল পেড়ে খাওয়ার সুযোগও পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা মাল্টি কেনার জন্য যোগাযোগ করলেও তারা প্রথমে স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণ করতে চান। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত ফল দেশের অন্য এলাকায় পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
বাগান থেকে মাল্টা কিনতে আসা স্থানীয় পাইকার মিলন মিয়া জানান, তিনি কলমাকান্দার নাজিরপুর এলাকার বাসিন্দা। গত দুই বছর ধরে এই বাগান থেকে মাল্টা কিনছেন। নিজের হাতে ফল কেটে খাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানান, এখানকার মাল্টা মিষ্টি ও রসালো।
তার ভাষ্য, প্রতি কেজি মাল্টা ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে কিনে স্থানীয় খুচরা বাজারে কিছুটা বেশি দামে বিক্রি করেন। এতে পাইকারি ও খুচরা—দুই পর্যায়েই লাভের সুযোগ থাকছে।
আরেক পাইকার মজিদ মিয়া বলেন, বাগানটিতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে নিজের হাতে ফল সংগ্রহ করছেন। স্বাদ ও মান ভালো হওয়ায় স্থানীয় বাজারে এ মাল্টার চাহিদাও রয়েছে বলে জানান তিনি।
উদ্যোক্তাদের হিসাবে, বাগান গড়ে তুলতে এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। চলতি মৌসুমে বাগানের পরিচর্যায় ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ টাকা। ফলন ভালো হওয়ায় এ মৌসুমে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকার বেশি মাল্টা বিক্রি হতে পারে বলে আশা করছেন তারা।
দুর্গাপুর উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আজিজুর রহমান জানান, কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় ২০২১-২২ অর্থবছরে বাগানটির যাত্রা শুরু হয়। গত বছর প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকার ফল বিক্রি হয়েছিল। চলতি মৌসুমে উৎপাদন ভালো হওয়ায় বিক্রির পরিমাণ গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
তিনি আরও জানান, এই বাগানের সাফল্য দেখে আশপাশের অনেক কৃষক মাল্টা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। ফলে পতিত জমি কাজে লাগিয়ে মাল্টা চাষের পরিধি ভবিষ্যতে আরও বাড়ার সুযোগ রয়েছে।
একসময় যেখানে পড়ে থাকত কয়লার স্তূপ, সেই জমিতেই এখন ফলছে সম্ভাবনার ফসল। পর্যটনকেন্দ্রিক এলাকার পাশে গড়ে ওঠা এই মাল্টা বাগান দেখাচ্ছে, পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও সঠিক কৃষি পরামর্শ কাজে লাগাতে পারলে পরিত্যক্ত জমিও হয়ে উঠতে পারে লাভজনক উদ্যোগের ক্ষেত্র। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান ও কৃষিভিত্তিক নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পথও খুলে দিতে পারে এমন উদ্যোগ।