ভারত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপে ইসলাম আগমনের ৯০০ হিজরি বছর পূর্তি উপলক্ষে নানা আয়োজন করা হয়েছে। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, ৫৪৮ হিজরি বা ১১৫৩ খ্রিস্টাব্দে মালদ্বীপের তৎকালীন রাজা ধোভেমি ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর ধীরে ধীরে বৌদ্ধ রাজ্যটি মুসলিম সালতানাতে রূপ নেয়।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দেশটির বিভিন্ন এলাকায় এ উপলক্ষে ধর্মীয় আলোচনা, খুতবা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতেও অংশ নেন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু।
এ উপলক্ষে হুলহুমালেতে সুলতান মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ গ্র্যান্ড মসজিদ ও ইসলামী সভ্যতা কেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। ইসলামের যুগে মালদ্বীপের প্রথম দিকের শাসকদের একজনের নাম অনুসারে কেন্দ্রটির নামকরণ করা হয়েছে।
ইসলাম প্রতিষ্ঠার আগে মালদ্বীপে কয়েক শতাব্দী ধরে বৌদ্ধধর্মের প্রভাব ছিল। ভারতীয় উপমহাদেশ ও শ্রীলঙ্কা থেকে বিভিন্ন সময়ে মানুষ দ্বীপপুঞ্জটিতে বসতি গড়ে তুলেছিল। পরবর্তী সময়ে বৌদ্ধধর্ম সেখানকার প্রধান ধর্মে পরিণত হয়।
প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার, স্তূপ ও অন্যান্য স্থাপনার বিভিন্ন নিদর্শন এখনো সেই সময়ের সাক্ষ্য বহন করে। অর্থাৎ, ইসলাম আসার আগে মালদ্বীপের সমাজ ও সংস্কৃতিতে বৌদ্ধ ঐতিহ্যের শক্ত অবস্থান ছিল।
তবে ধর্মীয় পরিবর্তনের অনেক আগেই ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যপথের মাধ্যমে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে মালদ্বীপের যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল।
ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌবাণিজ্যপথে অবস্থানের কারণে মালদ্বীপ আরব ও পারস্যের বণিকদের যাতায়াতের একটি অংশ হয়ে ওঠে। এসব বণিক আরব উপদ্বীপ ও উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে পূর্ব আফ্রিকা, ভারতীয় উপমহাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে নিয়মিত যাতায়াত করতেন।
মালদ্বীপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপণ্য ছিল কড়ি শামুক। বিপুল পরিমাণ কড়ি বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হতো এবং আফ্রিকা ও এশিয়ার বহু অঞ্চলে তা বিনিময়মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
এ ছাড়া শুকনো টুনা মাছ, নারকেল এবং নারকেলের ছোবড়াও ছিল উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যপণ্য। ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম গ্রহণের আগেই মুসলিম বণিক ও মালদ্বীপের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল বলে ঐতিহাসিকদের বিভিন্ন বিবরণে উঠে আসে।
মালদ্বীপের প্রচলিত ইতিহাসে ১১৫৩ সালকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ওই সময় রাজা ধোভেমি বৌদ্ধধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর তিনি মুসলিম নাম গ্রহণ করেন—সুলতান মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ।
রাজা ধোভেমির ইসলাম গ্রহণের সঙ্গে আবু আল-বারাকাত ইউসুফ আল-বারবারি নামে এক মুসলিম আলেম ও ইসলাম প্রচারকের নাম জড়িয়ে আছে। তবে ওই ব্যক্তির প্রকৃত পরিচয় নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
‘আল-বারবারি’ নামের কারণে তাকে উত্তর আফ্রিকার বারবারি অঞ্চলের মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করার একটি মত রয়েছে। আবার সোমালি ঐতিহ্যেও তাকে নিজেদের বলে দাবি করা হয়। অন্য একটি মত অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি ছিলেন ইউসুফ শামসুদ্দীন আত-তাবরিজি, যার কারণে তার পারস্য বংশোদ্ভূত হওয়ার ধারণাও পাওয়া যায়।
তবে তার প্রকৃত পরিচয় নিয়ে বিতর্ক থাকলেও রাজা ধোভেমির ইসলাম গ্রহণের ঘটনা মালদ্বীপে ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রচলিত ইতিহাসের অন্যতম প্রধান অধ্যায়।
ধোভেমি ইসলাম গ্রহণের পর দ্বীপপুঞ্জে নতুন ধর্মের বিস্তার শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে বৌদ্ধ রাজতন্ত্রের পরিবর্তে মুসলিম সালতানাত প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী কয়েক শতাব্দীতে বিভিন্ন রাজবংশের শাসন ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মালদ্বীপের রাষ্ট্র ও সমাজে ইসলামের প্রভাব আরও গভীর হয়।
মালদ্বীপে ইসলাম প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের সঙ্গে একটি জনপ্রিয় লোককাহিনিও যুক্ত রয়েছে। চতুর্দশ শতকে মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা মালদ্বীপ সফর করেছিলেন। তার বর্ণনায় স্থানীয় একটি কাহিনির উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে ‘রান্নামারি’ নামে এক সামুদ্রিক দানবের কথা বলা হয়েছে।
কাহিনি অনুযায়ী, ওই দানবকে শান্ত রাখতে নির্দিষ্ট সময় পরপর একজন তরুণীকে উৎসর্গ করা হতো। এক পর্যায়ে এক মুসলিম আগন্তুক দানবটির মোকাবিলা করেন। তিনি রাতে কোরআন তিলাওয়াত করে সেখানে অবস্থান করেন এবং এরপর দানবটি আর ফিরে আসেনি বলে ওই কাহিনিতে বলা হয়।
ঘটনাটি দেখে রাজা ইসলাম গ্রহণ করেন—এমন বর্ণনাও রয়েছে।
তবে এই কাহিনিকে সরাসরি মালদ্বীপে ইসলাম আগমনের ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবে দেখা হয় না। বরং এটি ইসলাম প্রতিষ্ঠার বহু বছর পর স্থানীয় লোকস্মৃতিতে গড়ে ওঠা একটি ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক কাহিনি হিসেবে বিবেচিত।
ইবনে বতুতা মালদ্বীপে কয়েক মাস অবস্থান করেছিলেন এবং কাজি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তার লেখায় সে সময়কার মালদ্বীপের মুসলিম সমাজ ও জীবনযাত্রার নানা বিবরণ পাওয়া যায়।
সময় গড়ানোর সঙ্গে ইসলাম মালদ্বীপের শুধু ধর্মীয় জীবনেই নয়, সংস্কৃতি, প্রশাসন ও স্থাপত্যেও গভীর প্রভাব ফেলে। দেশটির ঐতিহাসিক মসজিদগুলো এর অন্যতম নিদর্শন।
প্রবালপাথর দিয়ে তৈরি এসব মসজিদের স্থাপত্য মালদ্বীপের সামুদ্রিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং দেশটির ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের আলাদা বৈশিষ্ট্য বহন করে।
বর্তমানে মালদ্বীপের অধিকাংশ মানুষ মুসলিম এবং দেশের সাংবিধানিক ও জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গেও ইসলামের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক রয়েছে।
ইসলাম আগমনের ৯০০ হিজরি বছর পূর্তির এবারের আয়োজন তাই দেশটির ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও আধুনিক জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে প্রায় নয় শতাব্দী আগের সেই পরিবর্তনকে নতুন করে স্মরণ করার একটি উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।