বয়ঃসন্ধি একটি শিশুর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সময়। এ সময়ে শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি তার চিন্তাভাবনা, আবেগ, আত্মপরিচয় ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাতেও নানা পরিবর্তন আসে। ফলে এ বয়সে সন্তানকে শুধু শাসন না করে তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, অনুভূতিগুলো বোঝার চেষ্টা করা এবং সঠিক পথে পরিচালনা করা জরুরি।
ইসলামে সন্তান প্রতিপালনকে কেবল পার্থিব দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়নি। ঈমান, ইবাদত, নৈতিকতা ও উত্তম চরিত্রের শিক্ষা দিয়ে সন্তানকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে হজরত লুকমান (আ.)-এর সন্তানকে দেওয়া উপদেশগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। তাঁর উপদেশে তাওহিদ, নামাজ, সৎকাজ, অন্যায় থেকে বিরত থাকা, ধৈর্য, বিনয় ও উত্তম আচরণের শিক্ষা পাওয়া যায়।
বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানকে গড়ে তুলতে যেসব বিষয়ে অভিভাবকদের গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে—
সত্যবাদিতা, আমানতদারি, দায়িত্বশীলতা, বড়দের সম্মান এবং ছোটদের প্রতি স্নেহ—এসব গুণ সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই শেখানো প্রয়োজন। শুধু কথার মাধ্যমে নয়, বাবা-মায়ের নিজেদের আচরণেও এসব মূল্যবোধের প্রতিফলন থাকা জরুরি।
লুকমান (আ.) তাঁর সন্তানকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, কোনো কাজ অণু পরিমাণ হলেও তা আল্লাহর অজানা নয় এবং তার হিসাব রয়েছে। এ শিক্ষা সন্তানের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহির অনুভূতি তৈরি করতে পারে। (সুরা লুকমান, আয়াত: ১৬)
বয়ঃসন্ধিতে সন্তানকে নিয়মিত কোরআন পড়ার অভ্যাস করানো যেতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সেই ব্যক্তি, যে নিজে কোরআন শেখে এবং অন্যকে শেখায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০২৭)
তবে শুধু তিলাওয়াত শেখানোই নয়, আয়াতের অর্থ ও শিক্ষা বোঝার প্রতিও তাকে আগ্রহী করে তোলা দরকার। ছোট ছোট সূরার অর্থ শেখানো এবং সেগুলোর শিক্ষা দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
সন্তানের মধ্যে নামাজের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বোঝানো অভিভাবকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। রাসুলুল্লাহ (সা.) সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই নামাজের অভ্যাস গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছেন। (আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৫)
সুরা লুকমানে লুকমান (আ.) তাঁর সন্তানকে নামাজ প্রতিষ্ঠা, সৎকাজের নির্দেশ, অসৎকাজ থেকে বিরত থাকা এবং বিপদে ধৈর্য ধারণের উপদেশ দিয়েছেন। (সুরা লুকমান, আয়াত: ১৭)
কোরআনেও বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই সালাত অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৪৫)
তাই নামাজকে শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে নয়, বরং চরিত্র গঠনের অংশ হিসেবে সন্তানের সামনে তুলে ধরা যেতে পারে।
সন্তানকে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি অন্যের অধিকার ও অনুভূতির প্রতিও শ্রদ্ধাশীল হতে শেখাতে হবে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি সহানুভূতি, অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজ নেওয়া, বিপদে অন্যের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রাণীর প্রতি দয়া—এসব মানবিক গুণ তার চরিত্রে গড়ে তুলতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশুদের প্রতি স্নেহ ও মমতা প্রদর্শন করতেন। এক হাদিসে এসেছে, তিনি হজরত হাসান (রা.)-কে চুম্বন করলে এক ব্যক্তি বিস্ময় প্রকাশ করেন। তখন নবী (সা.) বলেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৯৭)
বয়ঃসন্ধির সঙ্গে শরীর ও মনে নানা পরিবর্তন আসে। এ বিষয়গুলো নিয়ে সন্তানকে ভয় দেখানো বা লজ্জায় ফেলার পরিবর্তে ইসলামের আলোকে শালীনতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, পোশাক ও বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে আচরণের সীমারেখা বোঝানো উচিত।
সন্তানের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ব্যক্তিগত পরিসর ও ঘুমের ব্যবস্থার বিষয়েও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। এসব বিষয় নিয়ে অভিভাবকদের উচিত সন্তানের সঙ্গে বয়স উপযোগী ও সম্মানজনক ভাষায় কথা বলা।
বয়ঃসন্ধিতে কখনো সন্তান চুপচাপ হয়ে যেতে পারে, আবার কখনো অতিরিক্ত স্বাধীনচেতা আচরণ করতে পারে। প্রতিটি পরিবর্তনকে অবাধ্যতা হিসেবে দেখার বদলে এর পেছনে থাকা কারণ বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন।
সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করুন। এমন পরিবেশ তৈরি করুন, যেখানে সে ভয় বা সংকোচ ছাড়াই নিজের সমস্যা, প্রশ্ন ও অনুভূতির কথা বলতে পারে। ইসলামী শিক্ষাতেও শিশুদের প্রতি কোমলতা ও ভালোবাসার গুরুত্ব রয়েছে।
বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানকে প্রয়োজনীয় নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে রাখা দরকার। তবে শাসনের অর্থ অপমান করা, ভয় দেখানো বা নির্যাতন করা নয়। ভুলের কারণ ও পরিণতি বোঝানো এবং যুক্তিসংগতভাবে সংশোধনের সুযোগ দেওয়াই হওয়া উচিত লক্ষ্য।
সন্তানকে ভুল করলে তা স্বীকার করা এবং ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। এতে তার আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ববোধ দুটোই বাড়তে পারে।
বয়ঃসন্ধিতে বন্ধু ও সামাজিক পরিবেশের প্রভাব অনেক বেড়ে যায়। তাই সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে এবং অনলাইনে কী ধরনের কনটেন্ট বা ব্যক্তিদের অনুসরণ করছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকা প্রয়োজন।
তবে অতিরিক্ত সন্দেহ বা সার্বক্ষণিক নজরদারির পরিবর্তে সন্তানের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করা বেশি কার্যকর। ভালো বন্ধু কেন গুরুত্বপূর্ণ এবং খারাপ সঙ্গ কী ধরনের সমস্যার কারণ হতে পারে, তা তাকে বুঝিয়ে বলা উচিত।
সন্তানকে ইসলামী মূল্যবোধ শেখানোর ক্ষেত্রে শুধু ভয় ও শাস্তির কথা না বলে আল্লাহর রহমত, ভালো কাজের সৌন্দর্য এবং নৈতিকতার উপকারিতাও তুলে ধরা প্রয়োজন।
সন্তান কোনো ধর্মীয় বিষয়ে প্রশ্ন করলে তাকে থামিয়ে না দিয়ে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। লুকমান (আ.)-এর উপদেশের ধরনেও সন্তানের সঙ্গে আন্তরিক ও স্নেহপূর্ণ যোগাযোগের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। তিনি বারবার সন্তানকে ‘হে আমার প্রিয় সন্তান’ বলে সম্বোধন করেছেন।
বয়ঃসন্ধিতে সন্তানকে নামাজ, রোজা, পবিত্রতা, পর্দা, হালাল-হারামসহ প্রয়োজনীয় ইসলামী বিধান সম্পর্কে বয়স উপযোগী জ্ঞান দেওয়া উচিত।
শুধু ‘এটা হারাম’ বা ‘এটা করা যাবে না’ বলার পরিবর্তে কেন কোনো বিষয় নিষিদ্ধ, এর পেছনে কী শিক্ষা রয়েছে এবং সঠিক আচরণ কী—তা সহজ ভাষায় বোঝানো হলে সন্তান বিষয়গুলো বুঝে গ্রহণ করার সুযোগ পায়।
সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য শেখাতে হবে। মানুষের চোখ এড়িয়ে কোনো ভুল কাজ করা সম্ভব হলেও আল্লাহর কাছ থেকে কোনো কিছু গোপন নয়—এ বিশ্বাস তার মধ্যে জবাবদিহির অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
ভালো কাজের পুরস্কার এবং অন্যায়ের পরিণতি সম্পর্কে বয়স উপযোগীভাবে বোঝানো হলে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্বশীলতা গড়ে উঠতে পারে।
সবশেষে, বয়ঃসন্ধিকালের সন্তানকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শুধু নির্দেশ বা শাসন নয়—ভালোবাসা, ধৈর্য, আদর্শ আচরণ, নিয়মিত যোগাযোগ এবং ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার সমন্বয় জরুরি। বাবা-মায়ের আচরণই সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষার মাধ্যম হতে পারে।