মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৩ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
ছবি তুলুন, তবে অন্যের কমফোর্টের কথাও ভাবুন: পিয়া জান্নাতুল অসুস্থ হলে ‘ওষুধ’ খোঁজে হাতি, শাবকদেরও খাওয়ায় ঔষধি গাছ শিশুর প্রথম নিরাপদ আশ্রয় মা, সম্পর্কের সেই ছাপ থাকে বড় হয়েও ইব্রাহিমি মসজিদ: ইতিহাস, স্থাপত্য ও সংঘাতের দীর্ঘ সাক্ষী হাতের নাগালে ফ্ল্যাগশিপ অভিজ্ঞতা, হেলিওর নতুন স্মার্টফোন ১১০ কেন্দ্রীয় সার্ভারে ত্রুটি, বিদেশি মিশনে সাময়িক ব্যাহত বাংলাদেশের ভিসা সেবা মীনা বাজারে চাকরির সুযোগ, নিয়োগ ভিজ্যুয়ালাইজার পদে প্রকৃত সাংবাদিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে সংজ্ঞা স্পষ্ট করার উদ্যোগ: তথ্য প্রতিমন্ত্রী বৃষ্টির বাধায় মাঠেই নামা হলো না, এশিয়ান গেমসের সেমিফাইনালে বাংলাদেশ আগাম সবজিতে হাসি ফুটছে লালমনিরহাটের কৃষকের মুখে

ইব্রাহিমি মসজিদ: ইতিহাস, স্থাপত্য ও সংঘাতের দীর্ঘ সাক্ষী

ইমরোজ শাহেদ
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের হেবরন শহরের পুরোনো অংশে অবস্থিত ঐতিহাসিক ইব্রাহিমি মসজিদ। স্থাপত্যশৈলীতে -এর সঙ্গে এর কিছু মিল রয়েছে। বিশাল পাথরের দেয়ালে ঘেরা এই স্থাপনাটি শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়; শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নানা শাসন, ধর্মীয় পরিবর্তন ও রাজনৈতিক সংঘাতের সাক্ষী হয়ে আছে।

মসজিদটির নিচে থাকা গুহাকে ঘিরে নবী ইবরাহিম (আ.), সারাহ, ইসহাক (আ.), ইসমাইল (আ.), ইয়াকুব (আ.) ও ইউসুফ (আ.) এবং তাঁদের স্ত্রীদের সমাধি রয়েছে বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় সূত্রে উল্লেখ করা হয়। বর্তমানে স্থাপনাটির একটি অংশ মুসলমানদের নামাজের জন্য ব্যবহৃত হয়, অন্য অংশ ইহুদি উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেখানে্রাহিমি মসজিদ পশ্চিম তীরের দক্ষিণাঞ্চলের হেবরন শহরের পুরোনো এলাকায় অবস্থিত। মসজিদের প্রবেশ ও ইবাদতের ক্ষেত্রেও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে।

কোথায় ইব্রাহিমি মসজিদ

ইব্রাহিমি মসজিদ পশ্চিম তীরের দক্ষিণাঞ্চলের হেবরন শহরের পুরোনো এলাকায় অবস্থিত। মসজিদের নামের সঙ্গে হেবরনের ঐতিহাসিক পরিচয়ও গভীরভাবে যুক্ত।

স্থাপনাটির নিচের গুহাটিকে ঘিরে এর ধর্মীয় গুরুত্ব তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় ওই গুহায় নবী ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যের সমাধি থাকার কথা বলা হয়েছে।

নামের পেছনের ইতিহাস

মসজিদটির নাম এসেছে নবী ইবরাহিম (আ.)-এর নাম থেকে। মুসলমানদের কাছে এটি ইব্রাহিমি মসজিদ নামে পরিচিত। বিভিন্ন লেখায় একে আল-হারাম আল-ইব্রাহিমি নামেও উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে ইহুদি ঐতিহ্যে স্থাপনাটির নিচের গুহাকে মাকফিলা গুহা বলা হয়। ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী, এখানে প্রাচীন পিতৃপুরুষ ও মাতৃপুরুষদের সমাধি রয়েছে। এ কারণে স্থানটি ইহুদি ধর্মেও গুরুত্বপূর্ণ।

অনন্য স্থাপত্য

প্রায় ২ হাজার ৪০ বর্গমিটার আয়তনের ইব্রাহিমি মসজিদ সাদা চুনাপাথরের বিশাল দেয়ালে ঘেরা। দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় ২ দশমিক ৬৮ মিটার। নিচের অংশে বড় বড় পাথরের সারি এবং ওপরের অংশে বিভিন্ন স্থাপত্য উপাদান যুক্ত রয়েছে।

মসজিদের ভেতরে রয়েছে খোলা প্রাঙ্গণ, বারান্দা, কক্ষ, করিডর, গম্বুজ ও মিনার। এর নিচে রয়েছে ঐতিহাসিক গুহা, যাকে ঘিরেই স্থাপনাটির ধর্মীয় গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।

মসজিদের চারপাশের বিশাল প্রাচীরকে ‘হাইর’ নামে উল্লেখ করা হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, এর প্রাথমিক নির্মাণ হেরোডীয় যুগের সঙ্গে সম্পর্কিত।

শাসন বদলেছে, বদলেছে স্থাপনাটির রূপ

ইব্রাহিমি মসজিদের বর্তমান রূপ এক দিনে তৈরি হয়নি। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শাসকের অধীনে এর স্থাপত্য ও ব্যবহার পরিবর্তিত হয়েছে।

রোমান ও বাইজেন্টাইন সময়

হেরোড দ্য গ্রেটের শাসনামলে এ স্থানের চারপাশে বিশাল পাথরের দেয়াল নির্মিত হয় বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে রোমান ও বাইজেন্টাইন শাসনামলে স্থাপনাটির ব্যবহার পরিবর্তিত হয় এবং একপর্যায়ে এখানে গির্জা নির্মিত হয়।

৬১৪ খ্রিস্টাব্দে পারস্য বাহিনীর আক্রমণে গির্জাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ইসলামী শাসনামলে

ফিলিস্তিন মুসলিম শাসনের অধীনে আসার পর স্থাপনাটি মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। উমাইয়া আমলে এর সম্প্রসারণ ও সংস্কার করা হয়। কবরগুলোর ওপর গম্বুজ নির্মাণসহ স্থাপত্যে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়।

আব্বাসীয় ও ফাতেমীয় আমলেও স্থাপনাটির গুরুত্ব বজায় থাকে। বিভিন্ন সময়ে নতুন দরজা, গম্বুজ ও অন্যান্য স্থাপত্য উপাদান যুক্ত করা হয়।

ক্রুসেডারদের সময়ে আবার গির্জা

১১০০ সালে ক্রুসেডাররা হেবরন দখল করার পর ইব্রাহিমি মসজিদ লুট করা হয় এবং স্থাপনাটিকে গির্জায় রূপান্তর করা হয়। এর পাশে একটি দুর্গও নির্মাণ করা হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়।

প্রায় ৯০ বছর স্থাপনাটি গির্জা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

সালাহউদ্দিন আইয়ুবির হাতে পুনরায় মসজিদ

১১৮৭ সালে হিত্তিনের যুদ্ধে বিজয়ের পর সালাহউদ্দিন আইয়ুবি হেবরন পুনরুদ্ধার করেন। এরপর ইব্রাহিমি স্থাপনাটি আবার মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।

সালাহউদ্দিন আসকালান থেকে একটি কাঠের মিম্বর এনে এখানে স্থাপন করেন। ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সেই মিম্বরটি এখনো মসজিদের অন্যতম প্রধান নিদর্শন। তাঁর আমলে মসজিদের সেবার দায়িত্ব পালনের জন্য কয়েকটি পরিবারকে হেবরনে বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলেও ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

উসমানি ও ব্রিটিশ আমল

উসমানি শাসনামলেও ইব্রাহিমি মসজিদের গুরুত্ব বজায় ছিল। বিভিন্ন সময়ে এর সংস্কার করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ ম্যান্ডেট আমলেও মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নকাজ চালানো হয়।

পরবর্তীতে ইসলামী সর্বোচ্চ পরিষদ স্থাপনাটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেয় এবং এর বিভিন্ন অংশ সংস্কার করে।

১৯৬৭ সালের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন

১৯৬৭ সালের জুন যুদ্ধের পর হেবরন ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এরপর শহরের ভেতরে ও আশপাশে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের সঙ্গে ইব্রাহিমি মসজিদকে ঘিরে উত্তেজনাও বাড়তে থাকে।

১৯৯৪ সালের হত্যাকাণ্ডের পর মসজিদের ব্যবহারে বড় পরিবর্তন আসে। স্থাপনাটির একটি অংশ মুসলমানদের জন্য এবং অন্য অংশ ইহুদিদের উপাসনার জন্য নির্ধারণ করা হয়। দুই অংশের মধ্যে লোহার দরজা, ব্যারিকেড ও নিরাপত্তাব্যবস্থা স্থাপন করা হয়।

১৯৯৪ সালের হত্যাকাণ্ড

ইব্রাহিমি মসজিদের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ১৯৯৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। ওইদিন ফজরের নামাজের সময় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী বারুখ গোল্ডস্টেইন মসজিদে নামাজরত মুসল্লিদের ওপর গুলি চালায়।

হামলায় ২৯ জন মুসল্লি নিহত এবং ১২৯ জন আহত হন। পরে গোল্ডস্টেইনও নিহত হয়।

ঘটনার পর তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। পরবর্তী সময়ে মসজিদের ভেতরের ব্যবস্থাপনা ও প্রবেশাধিকার নতুনভাবে নির্ধারণ করা হয়। মুসলমান ও ইহুদিদের জন্য আলাদা অংশ নির্ধারণের সিদ্ধান্তও এর পরেই কার্যকর হয়।

এর ফলে ইব্রাহিমি মসজিদ শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলি সংঘাতের অন্যতম স্পর্শকাতর স্থান হিসেবেও পরিচিতি পায়।

মসজিদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা

সালাহউদ্দিনের মিম্বর:
ইব্রাহিমি মসজিদের সবচেয়ে মূল্যবান ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর একটি। আবনুস কাঠের তৈরি এই মিম্বরে কাঠের সূক্ষ্ম কারুকাজ রয়েছে। পেরেকের পরিবর্তে কাঠের বিভিন্ন অংশ জোড়া দিয়ে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল বলে উল্লেখ রয়েছে।

ইসহাকিয়া নামাজের স্থান:
মসজিদের দক্ষিণ অংশে অবস্থিত প্রধান নামাজের স্থান। এখানে সালাহউদ্দিনের মিম্বর ও মিহরাবসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নিদর্শন রয়েছে।

ইব্রাহিমিয়া নামাজের স্থান:
নবী ইবরাহিম (আ.)-এর নামে পরিচিত এই অংশটি মসজিদের মাঝামাঝি এলাকায় অবস্থিত। এখানে ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর স্ত্রী সারাহর সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতীকী সমাধি রয়েছে।

ইয়াকুবিয়া নামাজের স্থান:
মসজিদের উত্তর অংশে অবস্থিত এই অংশটি নবী ইয়াকুব (আ.)-এর নামে পরিচিত। এখানেও প্রতীকী সমাধি রয়েছে।

মালিকিয়া ও জাওলিয়া নামাজের স্থান:
মসজিদের বিভিন্ন অংশে অবস্থিত এসব স্থানের সঙ্গে ইসলামী শাসনামলের বিভিন্ন ব্যক্তি ও স্থাপত্য-পর্বের সম্পর্ক রয়েছে।

মাকফিলা গুহা

ইব্রাহিমি মসজিদের নিচে অবস্থিত গুহাটি স্থাপনাটির ধর্মীয় গুরুত্বের কেন্দ্রবিন্দু। মুসলিম ও ইহুদি উভয় ধর্মীয় ঐতিহ্যেই গুহাটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়।

বিভিন্ন ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বর্ণনায় এখানে ইবরাহিম (আ.), ইসহাক (আ.), ইয়াকুব (আ.) এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সমাধি থাকার কথা বলা হয়েছে। গুহাটিতে প্রবেশের একাধিক পথ থাকলেও বর্তমানে সেগুলোর ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।

ইব্রাহিমিয়া তেকিয়া

মসজিদের কাছেই রয়েছে ইব্রাহিমিয়া তেকিয়া, যা স্থানীয়ভাবে দাতব্য খাবার বিতরণের একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। দরিদ্র ও অভাবী মানুষকে বিনামূল্যে খাবার দেওয়ার পাশাপাশি রমজান মাসে এর কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়।

স্থানীয় ঐতিহ্যে এর সঙ্গে নবী ইবরাহিম (আ.)-এর অতিথিপরায়ণতার স্মৃতিও যুক্ত। তাঁর নামে পরিচিত এই তেকিয়া হেবরনের সামাজিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যেরও একটি অংশ।

আজকের ইব্রাহিমি মসজিদ

বর্তমানে ইব্রাহিমি মসজিদ একটি ধর্মীয় স্থাপনার পাশাপাশি ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতের অন্যতম স্পর্শকাতর প্রতীক। মসজিদের ব্যবহার, প্রবেশাধিকার ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক ও উত্তেজনা রয়েছে।

১৯৯৪ সালের হত্যাকাণ্ডের পর স্থাপনাটি যে বিভাজনের মধ্য দিয়ে গেছে, তার প্রভাব আজও সেখানে মুসল্লি ও দর্শনার্থীদের প্রবেশ, ইবাদত এবং দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান। ফলে কয়েক হাজার বছরের ধর্মীয় ও স্থাপত্য ইতিহাস বহন করা এই স্থাপনাটি একই সঙ্গে বিশ্বাস, ইতিহাস, স্থাপত্য এবং ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক বাস্তবতার এক অনন্য সাক্ষী হয়ে আছে।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

আজকের নামাজের সময়সুচী

  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:৩৬ পূর্বাহ্ণ
  • ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ
  • ১৬:১১ অপরাহ্ণ
  • ১৭:৫৬ অপরাহ্ণ
  • ১৯:০৯ অপরাহ্ণ
  • ৫:৪৭ পূর্বাহ্ণ
©2026 All rights reserved
Design by: POPULAR HOST BD
themesba-lates1749691102