রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
দিনাজপুরের ১৩ উপজেলায় ১,৩১৭ মণ্ডপে পূজার প্রস্তুতি বাউফলে জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবস পালিত বিরামপুরে খালেদা জিয়া স্মৃতি গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন ফুটপাত যেখানে দখল হবে, সেখানে উচ্ছেদ অভিযান: ডিএনসিসি প্রশাসক দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি শ্রমিকদের বিদেশি ভাষাও জানতে হবে : শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৮ জনের মৃত্যু দু-একটি অঘটনের কারণে আলেম সমাজকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় : জামায়াত আমির অনলাইনে বিয়ে নিবন্ধনে অনিয়ম বাল্য-বহুবিয়ে কমবে: আইনমন্ত্রী বিনিয়োগে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি নেই বিপাকে নিম্ন আয়ের মানুষ

জর্জিয়ার পাহাড়ে হারিয়ে যাচ্ছে শতবর্ষী কাঠের মসজিদ

ইমরোজ শাহেদ
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৯ বার পড়া হয়েছে

জর্জিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তুরস্কের সীমান্তঘেঁষা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল আদজারা। অর্থোডক্স খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির অন্য অঞ্চলগুলোর তুলনায় আদজারার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস কিছুটা আলাদা। কয়েক শতাব্দী আগে উসমানীয় শাসনের সময় এ অঞ্চলে ইসলামের বিস্তার ঘটে। বর্তমানে এখানকার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মুসলিম।

আদজারার পাহাড়ি এলাকায় ছড়িয়ে থাকা ৫০টির বেশি ঐতিহাসিক কাঠের মসজিদ সেই ইতিহাসের দৃশ্যমান সাক্ষ্য। ১৮১৭ থেকে ১৯২৬ সালের মধ্যে নির্মিত এসব স্থাপনার অনেকগুলো এখন জরাজীর্ণ। কিছু মসজিদ এখনো ভালো অবস্থায় রয়েছে এবং নিয়মিত নামাজ আদায় হয়। তবে বেশ কয়েকটি মসজিদ দ্রুত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার মধ্যে রয়েছে।

স্থানীয় অধিকারকর্মী ও গবেষকদের আশঙ্কা, যথাযথ উদ্যোগ না নিলে আদজারার এই অনন্য ইসলামী স্থাপত্যের একটি বড় অংশ অদূর ভবিষ্যতে হারিয়ে যেতে পারে।

কাঠের স্থাপত্যে মসজিদের অনন্য বৈশিষ্ট্য

আদজারার ঐতিহাসিক মসজিদগুলোর একটি গুলেবি মসজিদ। দীর্ঘদিনের ক্ষয় ও অবহেলার চিহ্ন স্পষ্ট হলেও ভবনটির পুরোনো নির্মাণশৈলী এখনো নজর কাড়ে। ভেতরের দেয়ালে বিবর্ণ লাল ও নীল রঙের নকশা এবং মিম্বরে কাঠের সূক্ষ্ম কারুকাজ এর ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করছে।

তরুণ অধিকারকর্মী লিয়া দেকানাদজে পাঁচ বছর আগে প্রথম মসজিদটি দেখতে যান। তার মতে, অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানেই ভবনটির অবস্থা দৃশ্যত খারাপ হয়েছে। একসময় উজ্জ্বল ফিরোজা রঙের দরজাটিও এখন আবহাওয়া ও দীর্ঘদিনের অবহেলায় বিবর্ণ হয়ে গেছে।

খুলো শহরে স্থানীয় মুফতি আসলান আবাশিদজে আদজারার মসজিদগুলোর ইতিহাস সম্পর্কে বলেন, উসমানীয় প্রভাব থাকলেও এসব মসজিদ স্থানীয় মানুষের জীবন ও অর্থনৈতিক সামর্থ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের অর্থ ও সম্পদেই এগুলোর বেশির ভাগ নির্মিত হয়।

পাহাড়ি এলাকায় সহজলভ্য কাঠ ব্যবহার করে তৈরি হওয়ায় মসজিদগুলোর স্থাপত্যে স্থানীয় বাড়িঘরের নির্মাণরীতিরও প্রভাব রয়েছে। ফলে এগুলো শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, আদজারার নিজস্ব স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ হয়ে উঠেছে।

সোভিয়েত আমলে বন্ধ হয়ে যায় বহু মসজিদ

সোভিয়েত শাসন প্রতিষ্ঠার পর আদজারায় নতুন মসজিদ নির্মাণ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৩০-এর দশকে ধর্মবিরোধী রাষ্ট্রীয় অভিযান জোরদার হলে বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনাও বন্ধ করে দেওয়া হয়। অনেক মসজিদের মিনার পর্যন্ত সরিয়ে ফেলা হয়েছিল।

মুফতি আবাশিদজে জানান, ওই সময় বেশ কিছু মসজিদ দোকান, গুদামসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়। ফলে ধর্মীয় কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও ভবনগুলো পুরোপুরি পরিত্যক্ত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে মূল কাঠামো টিকে গেলেও অভ্যন্তরের নকশা ও অলংকরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কয়েকটি মসজিদে আবার ধর্মীয় কার্যক্রম শুরু হয়। এর মধ্যে খুলো এলাকার ঘোরজোমি মসজিদ স্থানীয় মুসলিমদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র। যত্নে রাখা এই মসজিদের অভ্যন্তরে নানা রঙের কাঠের অলংকরণ এখনো দৃশ্যমান।

তবে সোভিয়েত আমলের দমন-পীড়ন থেকে টিকে যাওয়া অনেক মসজিদ এখন নতুন সংকটে পড়েছে—অবহেলা, অর্থের অভাব এবং প্রাকৃতিক ক্ষয়।

আবহাওয়া ও অর্থ সংকটে ঝুঁকিতে কাঠের মসজিদ

কাঠের তৈরি হওয়ায় এসব ঐতিহাসিক স্থাপনা আবহাওয়ার প্রভাবে তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আদজারার তুষারময় শীত এবং আর্দ্র গ্রীষ্ম কাঠের ভবনগুলোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করে। অনেক মসজিদের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাও পুরোনো হয়ে গেছে, যা অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

গত বছর আগুনে দুটি মসজিদ ধ্বংস হয়। অগ্নিকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত না হলেও অন্তত একটি ঘটনায় বৈদ্যুতিক ত্রুটিকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সংস্কারের ব্যয়ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বড় বাধা। পাহাড়ধস, কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে আদজারার অনেক গ্রাম থেকে মানুষ বাতুমির মতো শহরে চলে যাচ্ছেন। ফলে গ্রামগুলোতে জনসংখ্যার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনৈতিক সামর্থ্যও কমছে।

আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত সাতিসখুরি মসজিদ পুনর্নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি আরও দুটি মসজিদের সংস্কার শেষ হয়েছে। তবে স্থানীয় গবেষক জিওর্গি রিঝভাদজে ও অধিকারকর্মী দেকানাদজের মতে, কাজের গতি এখনো প্রয়োজনের তুলনায় ধীর।

ঐতিহ্য রক্ষায় স্থানীয় উদ্যোগ

রিঝভাদজে ও দেকানাদজেসহ একদল স্থানীয় তরুণ মিলে ‘সলিডারিটি কমিউনিটি’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। সংগঠনটি আদজারার ইসলামী ঐতিহ্যের বিভিন্ন স্থাপনার তথ্য সংগ্রহ, মানচিত্র তৈরি এবং সেগুলোর বর্তমান অবস্থা যাচাইয়ের কাজ করত। একই সঙ্গে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করত তারা।

রিঝভাদজে বলেন, তাদের প্রচারণা শুরুর আগে আদজারার ঐতিহাসিক মসজিদ নিয়ে খুব বেশি আলোচনা ছিল না। রাজধানী তিবিলিসিতে বসবাসকারী অনেক মানুষও এই অঞ্চলের স্বতন্ত্র স্থাপত্য ঐতিহ্য সম্পর্কে খুব কম জানতেন।

তাদের উদ্যোগের আরেকটি লক্ষ্য ছিল জর্জিয়ার জাতীয় ইতিহাসে মুসলিম জর্জিয়ানদের ভূমিকা আরও দৃশ্যমান করা।

দেকানাদজের মতে, জর্জিয়ায় ইসলামকে অনেক সময় বাইরের কোনো জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়। কিন্তু আদজারার মুসলিমরা জর্জিয়ার স্থানীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতিরই অংশ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মুসলিম ও জর্জিয়ান পরিচয় একই সঙ্গে ধারণ করা যায় কি না—এমন প্রশ্নও কখনো কখনো উত্থাপিত হয়।

রিঝভাদজে মনে করেন, রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও মুসলিম ঐতিহ্য সংরক্ষণে আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। তার মতে, সংবিধানে ধর্মীয় বহুত্ববাদের স্বীকৃতি থাকলেও জর্জিয়ান মুসলিমদের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক অবদান তুলে ধরতে সরকারি উদ্যোগ সীমিত।

বাতুমিতেও ধর্মীয় স্থাপনার সংকট

আদজারার আঞ্চলিক রাজধানী এবং জর্জিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর বাতুমিতেও মুসলিমদের ধর্মীয় অবকাঠামো নিয়ে সমস্যা রয়েছে। শহরে একটি মসজিদ থাকলেও মুসল্লির তুলনায় এর ধারণক্ষমতা কম। ফলে অনেক সময় মুসল্লিদের বাইরে রাস্তায় নামাজ আদায় করতে হয়।

শহরে নতুন একটি মসজিদ নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হলেও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে জর্জিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিও ধর্মীয় ও নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর কার্যক্রমকে প্রভাবিত করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একীভূত হওয়ার আলোচনা স্থগিত রাখার সরকারি সিদ্ধান্তের পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। এর আগে বিদেশি অর্থায়ন গ্রহণকারী সংগঠনগুলোর ওপর বিধিনিষেধ আরোপের জন্য ‘ফরেন এজেন্ট’ আইন নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক দেখা দেয়।

সরকারের বক্তব্য, এসব আইনের উদ্দেশ্য জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। তবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আইনগুলোকে নাগরিক সমাজের ওপর চাপ সৃষ্টির পদক্ষেপ হিসেবে সমালোচনা করেছে।

বিদেশি অর্থায়নের সুযোগ সীমিত হওয়া এবং নতুন আইনের আওতায় নিবন্ধনের সঙ্গে যুক্ত সামাজিক ও প্রশাসনিক চাপের কারণে ‘সলিডারিটি কমিউনিটি’ও তাদের কার্যক্রম স্থগিত করেছে। এর ফলে আদজারার পাহাড়ি গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ও তাদের ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করা গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থানীয় উদ্যোগ বন্ধ হয়ে গেছে।

‘অবহেলাও ঐতিহ্য হারানোর কারণ হতে পারে’

গুলেবি মসজিদ থেকে পাহাড়ি পথে নামার সময় দেকানাদজে আশঙ্কা প্রকাশ করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ঐতিহাসিক মসজিদগুলোর কথা ধীরে ধীরে মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যেতে পারে।

গুলেবি মসজিদ দীর্ঘদিন ধরে আর ব্যবহৃত হচ্ছে না। বর্তমানে গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দাই খ্রিস্টান। তবে দেকানাদজের মতে, ভবনটি এখন ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, সেটি মূল বিষয় নয়। মসজিদটি স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং পুরো জর্জিয়ার ইতিহাসের অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

তার মতে, এসব স্থাপনা শুধু ইবাদতের স্থান ছিল না। স্থানীয় মানুষ এখানে একত্রিত হতেন, সামাজিক যোগাযোগ তৈরি করতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েও আলোচনা করতেন।

তাই এসব কাঠের মসজিদের সংরক্ষণকে শুধু ধর্মীয় স্থাপনা রক্ষার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলো আদজারার স্থানীয় স্থাপত্য, সামাজিক ইতিহাস এবং জর্জিয়ার বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

অধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, সরাসরি ধ্বংস বা দমন-পীড়নের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অবহেলাও কোনো ঐতিহ্যকে হারিয়ে দিতে পারে। আর জর্জিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে আদজারার মুসলিম ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ, উদ্যোগ ও জনপরিসরের আলোচনা—সবই আগের তুলনায় সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

এ বিভাগের আরো সংবাদ

আজকের নামাজের সময়সুচী

  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৪:৩৯ পূর্বাহ্ণ
  • ১১:৫১ পূর্বাহ্ণ
  • ১৬:০৬ অপরাহ্ণ
  • ১৭:৪৯ অপরাহ্ণ
  • ১৯:০২ অপরাহ্ণ
  • ৫:৪৯ পূর্বাহ্ণ
©2026 All rights reserved
Design by: POPULAR HOST BD
themesba-lates1749691102