নিজস্ব প্রতিবেদক: খাদ্যপণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশের সব ধরনের খাদ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন বিধিমালার আওতায় বড় শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে রাস্তার পাশের চটপটি, পিঠা, পুরি কিংবা ছোট খাবারের দোকানকেও নিবন্ধনের আওতায় আসতে হবে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ‘নিরাপদ খাদ্য (নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং) প্রবিধানমালা’ প্রকাশ করেছে। নতুন এই বিধিমালায় খাদ্য ব্যবসার ধরন অনুযায়ী নিবন্ধন ও লাইসেন্স গ্রহণের নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন নিয়মে রেস্তোরাঁ, বেকারি, পেস্ট্রি শপ, মিষ্টির দোকান, ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠানসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের খাদ্য ব্যবসায়ীদের নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে হবে।
অন্যদিকে শিশুদের ফর্মুলা দুধ, ফর্টিফায়েড খাদ্য, অর্গানিক ও জিএমও পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং কোল্ড স্টোরেজের মতো বিশেষায়িত খাদ্য ব্যবসার ক্ষেত্রে লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বিধিমালা অনুযায়ী, নিবন্ধন ও লাইসেন্সের মেয়াদ থাকবে তিন বছর। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে তা নবায়ন করতে হবে।
নিবন্ধনের ফি নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বনিম্ন ১ হাজার টাকা। আর নবায়নের ক্ষেত্রে দিতে হবে ৫০০ টাকা।
বড় খাদ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ফি নির্ধারণ হবে প্রতিষ্ঠানের ফ্লোরের আয়তন বিবেচনায়। ছোট প্রতিষ্ঠানের জন্য লাইসেন্স ফি ১ হাজার টাকা থেকে শুরু হবে। ১০ হাজার বর্গফুটের বেশি আয়তনের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এ ফি হবে ৫ হাজার টাকা।
খাদ্য সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত গুদামের ক্ষেত্রেও লাইসেন্সের বিধান রাখা হয়েছে। ২০ হাজার বর্গফুটের বেশি আয়তনের গুদামের লাইসেন্স ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ হাজার টাকা।
নিবন্ধন নেওয়া ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে খাবার প্রস্তুত, সংরক্ষণ ও পরিবেশনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যবিধি ও পরিচ্ছন্নতার নিয়ম মেনে চলতে হবে। বিধিমালায় এ ধরনের অন্তত ২০টি নির্দেশনা রাখা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে খাদ্য স্থাপনা পরিচালনা, পর্যাপ্ত জায়গা নিশ্চিত করা, পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা এবং কর্মীদের চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় স্থান রাখা। একই সঙ্গে খাদ্য তৈরিতে ব্যবহৃত পানিও নিরাপদ হতে হবে।
নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্য ব্যবসার পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভোক্তাদের জন্য নিরাপদ খাদ্য সরবরাহের ওপর নজরদারি বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া বলেন, বর্তমানে খাদ্যপণ্যের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বিএসটিআই এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ পৃথকভাবে অভিযান পরিচালনা করে।
তার মতে, একাধিক সংস্থার আলাদা অভিযানের কারণে অনেক সময় সমন্বয়হীনতা তৈরি হয় এবং ব্যবসায়ীদেরও নানা ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। বাজার তদারকির বিষয়টি একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা গেলে নজরদারি আরও কার্যকর হবে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের জন্যও নিয়ম মেনে চলার প্রক্রিয়া সহজ হবে।
হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া বলেন, নীতিগতভাবে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে মাঠপর্যায়ে বিধিমালা বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়েও ভাবতে হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বাজারে অনিরাপদ ও ভেজাল খাদ্যের উপস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে অনিরাপদ খাবার গ্রহণের কারণে শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মানুষ অসংক্রামক নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এর প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্য খাতেও; রোগীর চাপ বাড়ছে হাসপাতালগুলোতে।
নতুন বিধিমালা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে খাদ্য ব্যবসায় শৃঙ্খলা ফেরানোর পাশাপাশি ভোক্তাদের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার পথ আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।