বাংলাদেশে প্রতি ১৩ জন নারীর মধ্যে প্রায় একজন ৪৫ বছর বয়সের আগেই স্থায়ীভাবে মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার বা অকাল মেনোপজের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন। এ অবস্থা নারীদের দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)।
মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আইসিডিডিআর,বি জানায়, সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় বাংলাদেশে অকাল মেনোপজের হার পাওয়া গেছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর সামগ্রিক গড় হার ৭ দশমিক ১ শতাংশের তুলনায় এটি কিছুটা বেশি।
গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি বিশ্বস্বাস্থ্যবিষয়ক মেডিকেল জার্নাল বিএমজি গ্লোবাল হেলথে প্রকাশিত হয়েছে।
মেনোপজ নারীর জীবনের একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া। সাধারণত ৪৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সের মধ্যে স্থায়ীভাবে মাসিক বন্ধ হয়ে যায়।
তবে ৪৫ বছর বয়সের আগে মাসিক স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেলে তাকে আর্লি মেনোপজ এবং ৪০ বছর বয়সের আগেই মেনোপজ হলে তাকে প্রিম্যাচিউর মেনোপজ বলা হয়।
আইসিডিডিআর,বি বলছে, সময়ের আগেই মেনোপজ হলে নারীরা প্রত্যাশিত সময়ের অনেক আগেই ইস্ট্রোজেন হরমোনের সুরক্ষামূলক প্রভাব হারিয়ে ফেলেন। এর ফলে হৃদরোগ, অস্টিওপোরোসিস বা হাড়ক্ষয়, স্মৃতিশক্তি হ্রাস এবং বিষণ্নতার মতো সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এ কারণে অকাল মেনোপজ নারীর জীবনমানেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে গবেষকরা মনে করছেন।
গবেষণার জন্য ৪৪টি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের ৩০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী মোট ৭ লাখ ১৬ হাজার ৬৪৮ জন নারীর জাতীয় ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে বা ডিএইচএসের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
জরিপে অংশ নেওয়া নারীদের মাসিক ও প্রজননসংক্রান্ত ইতিহাস সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য নেওয়া হয়। যেসব নারী কমপক্ষে ছয় মাস ধরে মাসিক না হওয়ার কথা জানিয়েছেন অথবা মেনোপজ কিংবা জরায়ু অপসারণের তথ্য দিয়েছেন, তাদের মেনোপজ হয়েছে বলে গবেষণায় বিবেচনা করা হয়।
পরে ৪৫ বছর বয়সের আগেই যেসব নারীর মেনোপজ হয়েছে, তাদের আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১২ মাস ধরে মাসিক বন্ধ থাকার সংজ্ঞা ব্যবহার করে পুনরায় বিশ্লেষণের পরও গবেষণার ফলাফলে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি।
গবেষণায় বাংলাদেশে অকাল মেনোপজের হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ পাওয়া গেলেও দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে এ হার আরও বেশি।
নেপালে অকাল মেনোপজের হার ৭ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ভারতে ৮ শতাংশ। পাকিস্তানে এ হার ৫ দশমিক ৯ শতাংশ।
গবেষকদের মতে, এসব তথ্য থেকে বোঝা যায় যে সময়ের আগে মেনোপজ শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ইস্যু।
গবেষণায় অকাল মেনোপজের ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের নারীদের মধ্যে বৈষম্যের বিষয়টিও উঠে এসেছে।
আইসিডিডিআর,বি জানিয়েছে, শিক্ষা, আর্থিক অবস্থা, কর্মসংস্থান এবং প্রজননসংক্রান্ত ইতিহাসসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার পরও গ্রামীণ নারীদের মধ্যে ৪৫ বছরের আগে মেনোপজ হওয়ার আশঙ্কা শহরের নারীদের তুলনায় ১৭ শতাংশ বেশি।
গবেষকদের মতে, এ পার্থক্য স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি এবং জীবনযাত্রার মানের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের বৈষম্যের প্রতিফলন হতে পারে।
অকাল মেনোপজের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে।
যেসব নারীর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, তাদের তুলনায় প্রাথমিক শিক্ষাপ্রাপ্ত নারীদের অকাল মেনোপজের ঝুঁকি ১১ শতাংশ কম পাওয়া গেছে।
মাধ্যমিক শিক্ষা রয়েছে এমন নারীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি ২৮ শতাংশ কম এবং উচ্চশিক্ষিত নারীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি ৫৮ শতাংশ পর্যন্ত কম বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সে বিয়ে করেছেন এবং প্রথম সন্তান জন্ম দিয়েছেন—এমন নারীদের মধ্যে ৪৫ বছর বয়সের আগে মেনোপজ হওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলক কম দেখা গেছে।
অন্যদিকে ১৮ বছরের আগেই বিয়ে এবং সন্তান জন্মদানের অভিজ্ঞতা রয়েছে—এমন নারীদের মধ্যে অকাল মেনোপজের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে।
গবেষণাটির প্রধান লেখক ও আইসিডিডিআর,বির গবেষক রাইসা বিনতে ইসলাম বলেন, অকাল মেনোপজ কেবল জৈবিক কারণের ফল নয়।
তার মতে, ৪৪ দেশের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কম শিক্ষিত, গ্রামীণ এলাকায় বসবাসকারী এবং অল্প বয়সে বিয়ে বা সন্তান জন্মদান করেছেন—এমন নারীরা ধারাবাহিকভাবে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
তিনি বলেন, মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবায় সবার সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা প্রজনন স্বাস্থ্যের বাইরেও নারীদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
আইসিডিডিআর,বির ম্যাটার্নাল অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ ডিভিশনের সিনিয়র ডিরেক্টর ডা. আনিসুর রহমান বলেন, অকাল মেনোপজকে শুধু নারীর প্রজনন জীবনের একটি স্বাভাবিক ধাপ হিসেবে দেখলে হবে না।
তার মতে, মেনোপজের বয়স একজন নারীর ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হতে পারে। যেসব নারীর অকাল মেনোপজ হয়, তাদের হৃদরোগ, হাড়ক্ষয়, বিষণ্নতা এবং স্মৃতিশক্তি হ্রাসের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে।
তিনি নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে চিকিৎসকদের নারীদের মেনোপজের বয়স সম্পর্কে জানতে উৎসাহিত করেন।
তার ভাষ্য, এই তথ্যের মাধ্যমে ঝুঁকিতে থাকা নারীদের দ্রুত শনাক্ত করা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার পরিকল্পনা সহজ হতে পারে।
গবেষকদের মতে, অকাল মেনোপজের ঝুঁকি কমানো এবং এর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব মোকাবিলায় নারীদের শিক্ষা, সময়মতো বিয়ে ও মাতৃত্ব, পুষ্টি এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবায় সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।