বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় নেওয়ার নয় বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নৃশংসতা ও সহিংসতার মুখে প্রাণ বাঁচাতে হাজার হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসতে শুরু করেন। এরপর দেখতে দেখতে কেটে গেছে নয় বছর। কিন্তু নিজভূমিতে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন এখনো বাস্তবে রূপ নেয়নি।
প্রতিবছরই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে নানা উদ্যোগ ও আশ্বাসের কথা শোনা গেলেও মিয়ানমারের চলমান সংঘাত, রাখাইন অঞ্চলের পরিবর্তিত সামরিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নাগরিকত্বের সংকট এবং নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে প্রত্যাবাসন কার্যত আটকে আছে।
রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে কর্মসূচি পালন করবেন রোহিঙ্গারা। নিজেদের ওপর সংঘটিত নির্যাতন ও বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনাগুলো স্মরণ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বিচার ও ন্যায়বিচারের দাবি জানাবেন তারা।
একই সঙ্গে তাদের প্রধান আকাঙ্ক্ষা—নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজ জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়া। রোহিঙ্গা নেতাদের বক্তব্য, নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া তারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে চান না।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে অবস্থানের কারণে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে নানা ধরনের সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যা তৈরি হচ্ছে। ক্যাম্পে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বাড়ার অভিযোগের পাশাপাশি এর প্রভাব আশপাশের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকটের কারণে রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তাও আগের তুলনায় কমে আসছে। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষের খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণে নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে।
সরকারের শরণার্থী বিষয়ক কর্মকর্তারা বলছেন, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে বাংলাদেশ নিরাপদ প্রত্যাবাসনের ওপরই গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
রোহিঙ্গা নেতাদের মতে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না করে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সংকটটির সমাধান করতে হবে। তাদের দাবি, তারা কোনো দেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চান না; তারা শুধু শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ জীবনে ফিরতে চান।
রোহিঙ্গা যুবনেতা ও আরাকান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মুজিবুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়; এটি আন্তর্জাতিক পরিসরের একটি সংকট। রাখাইন বা আরাকানের বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই প্রত্যাবাসনের পরিকল্পনা করতে হবে।
তার দাবি, বর্তমানে আরাকানের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে প্রত্যাবাসনের বাস্তবতা নির্ধারণে সেখানকার বর্তমান রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
মুজিবুর রহমান আরও বলেন, প্রত্যাবাসন কার্যকর করতে চীন ও ভারতের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমঝোতা ও কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে।
রোহিঙ্গা সংকটের নয় বছর পূর্তিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন প্রত্যাবাসন কবে শুরু হবে এবং সেটি কতটা নিরাপদ ও টেকসই হবে। নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, বসতভিটায় ফেরার অধিকার এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া কতটা সফল হবে, তা নিয়েও রয়েছে বড় অনিশ্চয়তা।
বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি এই শরণার্থী সংকট যেমন অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ তৈরি করছে, তেমনি রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎও আটকে আছে অনিশ্চয়তার বেড়াজালে। তাই নয় বছর পরও তাদের একটাই প্রত্যাশা—নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করে নিজ জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ।