দেশের চলমান লোডশেডিং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তেলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে আরও বেশি কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া পরিশোধের পাশাপাশি এসব কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, তেলচালিত কেন্দ্রগুলোকে সর্বোচ্চ সক্ষমতায় কাজে লাগানো গেলে জাতীয় গ্রিডে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অতিরিক্ত বিদ্যুৎ যুক্ত হতে পারে। একই সঙ্গে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর চাপ কমিয়ে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ইতোমধ্যে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে প্রায় ৮০ শতাংশ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের নির্দেশ দিয়েছে। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সভাপতিত্বে একটি বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ফার্নেস তেল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারলে জাতীয় গ্রিডে আরও প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ হতে পারে।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানান, লোডশেডিং সামাল দিতে বর্তমানে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বেশি বিদ্যুৎ নেওয়া হচ্ছে। শুধু সন্ধ্যার ব্যস্ত সময় নয়, দিনের বেলাতেও এসব কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রাইভেট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাতের ভাষ্য, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা বর্তমানে পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সরকারের কাছে বকেয়া পাওনা পরিশোধ হলে দ্রুত তেল আমদানি করে এসব কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে।
তার দাবি, বর্তমানে বেসরকারি কেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। বকেয়া পরিশোধ করা হলে আরও প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের সক্ষমতা কাজে লাগানো সম্ভব হতে পারে।
তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বাড়তি বিদ্যুৎ পাওয়া গেলে গ্যাসচালিত কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমিয়ে সেই গ্যাস শিল্প খাতে সরবরাহ করার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের হিসাবে, বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর চাপ কমানো গেলে শিল্প খাতে গ্যাসের সংকটও কিছুটা লাঘব করা সম্ভব।
চলতি মাসের শুরুতে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হয়।
বিশ্ববাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির দাম বাড়ায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন তুলনামূলক সাশ্রয়ী হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ কারণে বিদ্যমান তেলচালিত কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা কাজে লাগানোর দিকে নজর দিয়েছে সরকার।
বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের মতে, প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা কাজে লাগানো গেলে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের সমপরিমাণ জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব। ফলে নতুন এলএনজি অবকাঠামোর ওপর তাৎক্ষণিক চাপও কিছুটা কমতে পারে।
এদিকে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা বকেয়া পাওনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পাওনা দ্রুত পরিশোধ করা গেলে জ্বালানি সংগ্রহ করে উৎপাদন বাড়ানোর প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছেন কেন্দ্র মালিকরা।
অন্যদিকে ফার্নেস তেল ব্যবহার করে আপাতত প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি নিচ্ছে পিডিবি।
সব মিলিয়ে, একদিকে লোডশেডিং কমানো এবং অন্যদিকে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো—দুই লক্ষ্য সামনে রেখেই তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানোর এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর বকেয়া দ্রুত পরিশোধ এবং প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিশ্চিত করা।