সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ককে নিয়ে মক্কায় নতুন একটি প্রতিরক্ষা জোটের আত্মপ্রকাশ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। ন্যাটোর আদলে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ধারণা সামনে আসায় অনেকে এটিকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবেও অভিহিত করছেন। ৭ আগস্ট গঠিত এই জোট ভবিষ্যতে আরও দেশকে যুক্ত করার সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছে।
জোটটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—কোনো সদস্য রাষ্ট্রের ওপর হামলাকে অন্য সদস্যদের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করে সম্মিলিত প্রতিক্রিয়ার নীতি। ফলে নতুন এই কাঠামো ঘিরে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সমীকরণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এরই মধ্যে আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশ এই জোটে যুক্ত হবে কি না। কারণ জোটের তিন সদস্য সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গেই ঢাকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তবে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি এক নয়—এমন বাস্তবতা সামনে রেখে সম্ভাব্য সিদ্ধান্তকে সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ককে নিয়ে গঠিত সম্ভাব্য বৃহত্তর প্রতিরক্ষা কাঠামোয় বাংলাদেশের যোগদানের সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, ঢাকা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। তবে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এর আগে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে তিনি এ বিষয়ে কথা বলেছিলেন। শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান তিনি।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সৌদি আরবসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতার পথে রয়েছে। গত জুলাইয়ে লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দাব ও এডেন উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ এবং জ্বালানি রুটের নিরাপত্তায় সৌদি নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা উদ্যোগে বাংলাদেশ যুক্ত হয়েছে। পাকিস্তান ও তুরস্কও এই উদ্যোগের সমর্থকদের মধ্যে রয়েছে।
অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা করা বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো বিষয় নয়। এখন প্রশ্ন হলো, এই সহযোগিতাকে কি একটি আনুষ্ঠানিক যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া হবে?
বাংলাদেশ চাইলে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বা নিরাপত্তা জোটে অংশ নিতে পারে কি না—এ নিয়ে সংবিধানে সরাসরি কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সংবিধানের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত নীতিগুলো অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সার্বভৌমত্ব, সমতা, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং জাতিসংঘ সনদের প্রতি শ্রদ্ধার ওপর প্রতিষ্ঠিত। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকার নীতিও গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে করা চুক্তি সংবিধান অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতি ও সংসদের সামনে উপস্থাপনের বিধান রয়েছে। যুদ্ধ ঘোষণা বা যুদ্ধে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রেও সংসদের সম্মতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
তাই মূল প্রশ্ন শুধু ‘বাংলাদেশ জোটে যোগ দিতে পারবে কি না’—এমন নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশকে কী ধরনের সামরিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা গ্রহণ করতে হবে।
পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের আলোচনায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অনিবার্যভাবে সামনে আসে। পাকিস্তানি বাহিনীর দমন-পীড়নের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল এবং দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত হয়।
পাকিস্তান বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। এরপর দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়েছে। বর্তমানে বাণিজ্য, কূটনীতি ও জনগণের যোগাযোগের স্বার্থে পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখা এবং একটি যৌথ সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা কিংবা সামুদ্রিক নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়াতে আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটের প্রয়োজন নাও হতে পারে।
সৌদি আরব বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অংশীদার। দেশটিতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত, যারা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, জ্বালানি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ রয়েছে।
তুরস্কও বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠেছে। ড্রোন, নৌ-প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে দেশটির সক্ষমতা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতের জন্য সম্ভাবনাময়। ফলে তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো ঢাকার জন্য লাভজনক হতে পারে।
তবে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা যেন কোনো নির্দিষ্ট সামরিক ব্লকের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হওয়ার পর্যায়ে না যায়—সেই বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের যেকোনো বড় প্রতিরক্ষা সিদ্ধান্তে ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে ভারতের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। ভারত বাংলাদেশের প্রতিবেশী এবং পাকিস্তানকে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে আসছে। একই সঙ্গে পাকিস্তান ও তুরস্কের ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্কও নয়াদিল্লির নজরে থাকার কথা।
এ অবস্থায় বাংলাদেশ যদি পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে একটি সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যুক্ত হয়, তাহলে ভারত সেটিকে নিজের পূর্ব সীমান্তের নিরাপত্তা সমীকরণের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
বাংলাদেশ অবশ্যই স্বাধীনভাবে তার পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি নির্ধারণ করবে। একইভাবে ভারতেরও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভেটো দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে আঞ্চলিক নিরাপত্তা বাস্তবতা উপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়াও বাংলাদেশের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
পাকিস্তানের অতীত জোট রাজনীতিও এ ক্ষেত্রে একটি শিক্ষা হতে পারে। শীতল যুদ্ধের সময় ভারতকে মোকাবিলায় পাকিস্তান পশ্চিমা সামরিক জোট সিয়াটো ও সেন্টোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সংঘাতের পরিস্থিতিতে জোটের প্রতিশ্রুতি প্রত্যাশিত মাত্রায় কার্যকর হয়নি।
এ অভিজ্ঞতা দেখায়, শুধু চুক্তিতে থাকা যথেষ্ট নয়; একটি সামরিক জোট কার্যকর করতে সদস্য দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদি অভিন্ন স্বার্থ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রয়োজনের সময় বাস্তব সহযোগিতার সক্ষমতা থাকতে হয়।
বাংলাদেশের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—দেশটি কি একটি নির্দিষ্ট প্রতিরক্ষা বলয়ের অংশ হবে, নাকি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রয়োজনভিত্তিক সহযোগিতা বজায় রেখে কৌশলগত স্বাধীনতা ধরে রাখবে?
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তুরস্কের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, সৌদি আরবের কাছ থেকে বিনিয়োগ ও সামুদ্রিক সহযোগিতা এবং পাকিস্তানের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক—এসব সুবিধা পাওয়ার জন্য একটি যৌথ সামরিক জোটে যোগ দেওয়া অপরিহার্য নয়।
বরং আকাশ প্রতিরক্ষা, ড্রোন প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, সামুদ্রিক নজরদারি এবং নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে বাংলাদেশের বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে—কোনো একটি সামরিক শিবিরের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে একাধিক দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা।
ভারতের সঙ্গে স্থিতিশীল নিরাপত্তা সম্পর্ক, তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সহযোগিতা, সৌদি আরবের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামুদ্রিক অংশীদারিত্ব এবং পাকিস্তানের সঙ্গে বাস্তবসম্মত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক—সবগুলোই একই সঙ্গে বজায় রাখা সম্ভব।
শেষ পর্যন্ত নতুন প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়া না দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের নিজস্ব সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। তবে সেই সিদ্ধান্ত এমন হওয়া জরুরি, যাতে দেশের নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়ে, কিন্তু অন্য কোনো রাষ্ট্রের সংঘাত বা সামরিক স্বার্থের কারণে বাংলাদেশ অনিচ্ছায় ভবিষ্যতের কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বাধ্যবাধকতায় না পড়ে।
কৌশলগত স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রেখে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়াই হতে পারে ঢাকার সবচেয়ে নিরাপদ পথ।