নেপালে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশটির মধ্যাঞ্চল। তিব্বত অঞ্চলে ভূমিকম্প আঘাত হানার মাত্র তিন মিনিটের ব্যবধানে বাগমাতি প্রদেশের রসুয়া ও আশপাশের জেলাগুলোতে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস শুরু হয়। বুধবার (২৬ আগস্ট) ঘটে যাওয়া এ দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৫৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৪০৩ জন, যাদের বড় একটি অংশ বিদেশি পর্যটক।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল দেশটির পার্লামেন্টে জানান, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর মাত্র তিন মিনিট পর, সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে বন্যার সূত্রপাত হয় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তবে ভূমিকম্পের সঙ্গে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
নেপাল পুলিশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত দুর্যোগকবলিত বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৫৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে রসুয়ায় একজন, নুয়াকোটে ১১, ধাদিংয়ে ১৮, চিতওয়ানে ৩৩, গোর্খায় ১৯, তানাহুঁতে ৭ এবং নওয়ালপুরে ১১ জনের মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বড় অংশই বিদেশি নাগরিক বলে জানিয়েছে নেপাল পর্যটন বোর্ড। ৪০৩ জন নিখোঁজের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি এবং ৬১ জন নেপালি। বিদেশিদের মধ্যে ভারতের ১৩৩ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭ জন এবং যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ২৬টি দেশের নাগরিক থাকার ধারণা করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে ২০০ জন নারী ও ২০৩ জন পুরুষ।
ট্যুর অপারেটরদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ পর্যটকদের অনেকেই ভারত ও নেপালের সীমান্তবর্তী মানস সরোবরের পথে ছিলেন। ফলে পর্যটননির্ভর এই অঞ্চলে দুর্যোগের প্রভাব আরও গভীর হয়ে উঠেছে।
দুর্যোগের ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতায়ও। রসুয়ার বাসিন্দা ৫৬ বছর বয়সী রাজু ভাদেল জানান, সকালে তার ভগ্নিপতি ফোন করে পরিবারের বাড়ি বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়ার কথা জানান। পরিবারের তিন সদস্যকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও তার এক ভাই এখনো নিখোঁজ।
নেপাল পুলিশের প্রকাশিত ছবি ও স্থানীয়দের ভিডিওতে নদীর প্রবল স্রোতে ঘরবাড়ি ভেসে যাওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে। কোথাও আবার কাদামাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা বাড়ির শুধু ছাদ বা ওপরের অংশ দৃশ্যমান ছিল।
দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে দেশটির বিদ্যুৎ ব্যবস্থাতেও। নেপালের বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ মিলিয়ে প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উৎপাদনকেন্দ্রের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র এখনো পাওয়া যায়নি। নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে প্রশাসন। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করতে নেপাল সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার ও বিশেষ দুর্যোগ মোকাবিলা দল মোতায়েন করেছে।
নেপালের পাশাপাশি তিব্বতেও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভির তথ্য অনুযায়ী, আকস্মিক বন্যায় তিব্বতের গিরং এলাকায় অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন ২৬৫ জন। নেপাল সীমান্তবর্তী তিব্বতের একটি বাণিজ্যকেন্দ্রে ভূমিধসে ব্যাপক হতাহতের আশঙ্কা করা হচ্ছে। নিখোঁজদের উদ্ধারে সর্বাত্মক অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং।
দুর্যোগের কারণ নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো ব্যাখ্যা না মিললেও ভূমিকম্পের পর এত অল্প সময়ের মধ্যে বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার পরই ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র এবং এই ভয়াবহ দুর্যোগের পেছনের কারণ আরও স্পষ্ট হবে বলে আশা করা হচ্ছে।