দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামে গড়ে উঠেছে ব্যতিক্রমী এক মিনি চিড়িয়াখানা ও পার্ক। সেখানে উট পাখিসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন স্থানীয় ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা। তবে পার্কটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এখন উট পাখির ছয়টি বাচ্চা।
পার্বতীপুর উপজেলার হাবড়া ইউনিয়নের মরনাই গ্রামের তাহেরপাড়া বাজারসংলগ্ন এলাকায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই মিনি চিড়িয়াখানা ও পার্ক গড়ে তুলেছেন প্রকৌশলী মো. রইচ উদ্দীন মিয়া বাবুল। শখের বসে শুরু করা উদ্যোগটি এরই মধ্যে স্থানীয়দের মধ্যে বেশ আগ্রহ তৈরি করেছে।
পার্কটিতে ইনকিউবেটরের মাধ্যমে ৭টি উট পাখির বাচ্চা ফুটেছে। এর মধ্যে একটি মারা গেলেও বর্তমানে ছয়টি বাচ্চা সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে। গত ২৪ মে ডিম থেকে বাচ্চাগুলো বের হয়।
পার্কের উদ্যোক্তা জানান, কয়েক মাস আগে ঢাকার একটি স্থান থেকে উট পাখির এক জোড়া নিয়ে আসেন তিনি। পার্কে আনার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে পাখি দুটি ২৪টি ডিম দেয়।
পরে দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) জেনেটিকস অ্যান্ড অ্যানিমেল ব্রিডিং বিভাগের শিক্ষক ও গবেষকদের সহযোগিতা নেওয়া হয়। ডিমগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারের ইনকিউবেটরে রাখা হয়। সেখান থেকে পাঁচটি এবং পার্কের নিজস্ব ইনকিউবেটরে আরও দুটি বাচ্চা সফলভাবে ফুটে বের হয়।
উট পাখির বাচ্চাগুলোকে নিরাপদে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দিতে বিষয়টি এতদিন অনেকটা আড়ালে রাখা হয়েছিল বলে জানান উদ্যোক্তা।
চলতি আগস্টে দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম ও জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা পার্কটি পরিদর্শনে গেলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এরপর থেকেই উট পাখির ছোট ছোট বাচ্চা দেখতে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে।
পার্কে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল আকৃতির দেহ, লম্বা ঘাড় ও শক্তিশালী পায়ের উট পাখিগুলোই দর্শনার্থীদের প্রধান আকর্ষণ। উড়তে না পারলেও বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই পাখির প্রজননে সাফল্য পাওয়ায় প্রত্যন্ত এলাকার এই উদ্যোগটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
হাবিপ্রবির জেনেটিকস অ্যান্ড অ্যানিমেল ব্রিডিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. রাশেদুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশে উট পাখির বংশবিস্তার নিয়ে ২০২০ সাল থেকে গবেষণা করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
তিনি বলেন, ২০২১ ও ২০২২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরিতে একাধিকবার ইনকিউবেটরে উট পাখির ডিম বসানো হলেও প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি। ২০২৩ সালে একটি ডিম থেকে বাচ্চা ফুটলেও কয়েকদিন পর সেটি মারা যায়।
তার মতে, দিনাজপুরের একটি ব্যক্তিগত পার্কে ছয়টি উট পাখির বাচ্চা সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা সংশ্লিষ্টদের জন্য উল্লেখযোগ্য সাফল্য। যথাযথ পরিচর্যা, গবেষণা এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখা গেলে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও এ ধরনের সাফল্য ছড়িয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
দিনাজপুর জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, একটি উট পাখি বছরে প্রায় ৬০ থেকে ৮০টি পর্যন্ত ডিম দিতে পারে। প্রতিটি ডিমের ওজন প্রায় দেড় কেজি। ঘাস, শাকসবজি ও পোল্ট্রি ফিডসহ সহজলভ্য বিভিন্ন খাবার উট পাখির খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
দিনাজপুর জেলা ভেটেরিনারি সার্জন ডা. আশিকা আকবর তৃষা বলেন, সৌখিনভাবে পালনের পাশাপাশি উট পাখি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করতে পারে। ভবিষ্যতে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হলে বাণিজ্যিকভাবে উট পাখি পালন এবং রপ্তানির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখার সম্ভাবনা রয়েছে।
পার্বতীপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. পবিত্র কুমার জানান, তিনি জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুর রহিমসহ সম্প্রতি পার্কটি পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়েছে।
শখ থেকে শুরু হওয়া ছোট্ট এই উদ্যোগে উট পাখির সফল প্রজনন এখন নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। প্রত্যন্ত গ্রামের এই মিনি চিড়িয়াখানা ভবিষ্যতে বিনোদনের পাশাপাশি উট পাখি পালন ও গবেষণার একটি সম্ভাবনাময় কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।