একজন দক্ষ আইনজীবী হয়ে উঠতে কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও নিয়মিত অধ্যয়নের কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, আইনজীবীরা শুধু আদালতে মামলা পরিচালনা করেন না, আইনগত দিকনির্দেশনার মাধ্যমে সমাজকেও সঠিক পথে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখেন।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত ল ফেস্টে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন তিনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে একজন আইনজীবীর সামনে নানা পথ থাকতে পারে। এমনকি তিনি ‘ফিক্সিং অ্যান্ড ফক্সিং’-কে ধনী ল’ইয়ার হওয়ার শর্টকাট হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে প্রকৃত অর্থে ভালো আইনজীবী হতে হলে পড়াশোনার কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, আইনজীবীদের ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ার’ বলা যায়। কারণ সমাজ পরিবর্তন ও নানা ধরনের ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়, আর আইনজীবীরা আইনের মাধ্যমে মানুষকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন। এ কারণে আদালতে একজন আইনজীবীর প্রতিটি বক্তব্য ও শব্দচয়ন গুরুত্বপূর্ণ।
আইনমন্ত্রী বলেন, একজন চিকিৎসক রোগী দেখার সময় মূলত রোগীর চিকিৎসার বিষয়টিই বিবেচনা করেন। কিন্তু একজন আইনজীবী আদালতে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় বিচারক, নিজের মক্কেল, বিপক্ষের আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট সবার বিষয় মাথায় রাখেন।
মামলার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সঠিক আইনি ব্যাখ্যা আদালতের সামনে তুলে ধরা আইনজীবীর অন্যতম দায়িত্ব বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তার ভাষ্য, অনেক আইন শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থাকে একদিন আদালতে দাঁড়িয়ে ‘মাই লর্ড’ বলে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করার। সেই স্বপ্ন পূরণ করতে হলে শুরু থেকেই পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
আইনজীবীদের পেশাগত জীবনের শুরুর দিকের বাস্তবতার কথাও তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, অনেক নতুন আইনজীবীকে দীর্ঘ সময় কোনো আয় ছাড়াই কাজ করতে হয়। ধীরে ধীরে কাজের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের আয়ও বাড়ে।
একপর্যায়ে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান একজন আইনজীবীর এমন পেশাগত মূল্য তৈরি করে, যখন তার উপস্থিতিই মামলায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
নিজের কর্মজীবনের একটি অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী জানান, একটি গুরুত্বপূর্ণ কর মামলায় তার সিনিয়রের নির্দেশে তিনি দীর্ঘদিন আদালতের যুক্তিতর্কের নোট তৈরি করেছিলেন। পরে সেই সিনিয়র আইনজীবী শুনানিতে বড় কোনো বক্তব্য না দিয়েও মামলাটিতে অংশ নেন এবং মামলায় জয়লাভের পর বড় অঙ্কের পারিশ্রমিক পান।
এই অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তিনি বোঝান, একজন আইনজীবীর দীর্ঘদিনের পড়াশোনা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাই শেষ পর্যন্ত তার পেশাগত মূল্য নির্ধারণ করে।
আইনমন্ত্রী বলেন, যোগ্যতার ভিত্তিতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের বাছাই করা হচ্ছে। কোনো ধরনের হস্তক্ষেপের সুযোগ না রেখে মেধাক্রম অনুসারে শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
এর মাধ্যমে দক্ষ, যোগ্য ও দুর্নীতিমুক্ত আইনজীবীদের একটি নতুন প্রজন্ম তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
আইনজীবী একই সঙ্গে মক্কেলের প্রতি দায়িত্বশীল এবং আদালতের একজন কর্মকর্তা—এ বিষয়টিও শিক্ষার্থীদের মনে করিয়ে দেন আইনমন্ত্রী।
তিনি বলেন, মানুষ তার বিপদের সময় আস্থা রেখে আইনজীবীর কাছে নিজের বিষয় তুলে দেন। তাই মক্কেলের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি আদালতকে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সহায়তা করাও আইনজীবীর দায়িত্ব।
নবীন আইনজীবীদের সততা ও নৈতিকতার সঙ্গে পেশাগত দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কর্মজীবনে নানা ধরনের ভালো-মন্দ পরিস্থিতি ও প্রলোভনের মুখোমুখি হতে হবে। এসব ক্ষেত্রে সঠিক ও নৈতিক পথ বেছে নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
আইনমন্ত্রী আইন শিক্ষার্থীদের আইন সংস্কারের কাজে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান। প্রচলিত কোনো আইনে অসংগতি থাকলে কিংবা পরিবর্তনের প্রয়োজন মনে হলে সংশ্লিষ্ট প্রস্তাব ও আইনের খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, তরুণদের দেওয়া এসব প্রস্তাব সরকার বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে। নতুন প্রজন্মের চিন্তা ও ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশের আইন ও বিচারব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বক্তব্যের শেষ দিকে দেশের বিভিন্ন পরিবর্তনের ধারায় তরুণ ও শিক্ষার্থীদের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। ভবিষ্যতে গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার ও উন্নত বাংলাদেশ গঠনে তরুণদের ভূমিকা অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আগামী প্রজন্মের জন্য সুন্দর ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করে এ কাজে তরুণদের সহযোগিতাও কামনা করেন আইনমন্ত্রী।